ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানির কঠোর অবস্থান: যুদ্ধের মুখে কূটনীতির পরিবর্তন
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোতে আলী লারিজানি একজন শান্ত ও বাস্তববাদী মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি পশ্চিমা দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ওপর গবেষণা করেছেন এবং পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে তাঁর কথার ধরন আমূল বদলে গেছে।
জ্বালাময়ী বক্তব্য ও পরিবর্তিত অবস্থান
গত ১ মার্চ, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরের মৃত্যুর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লারিজানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী ইরানি জাতির হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়েছে। আমরা তাদের হৃদয় পুড়িয়ে দেব এবং তাদের অনুশোচনা করতে বাধ্য করব।'
লারিজানি আরও উল্লেখ করেন যে ইরানের সেনারা ও জাতি আন্তর্জাতিক নিপীড়কদের এমন শিক্ষা দেবে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে 'ইসরায়েলি ফাঁদে পড়েছেন' বলে অভিযোগ করেন।
লারিজানির পটভূমি ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার
১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানি একটি প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য, যাকে টাইম ম্যাগাজিন 'ইরানের কেনেডি পরিবার' বলে অভিহিত করেছে। তাঁর বাবা মির্জা হাসেম আমোলি একজন বিখ্যাত ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন। লারিজানি শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে গণিত ও কম্পিউটার প্রকৌশলে স্নাতক এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পশ্চিমা দর্শনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তিনি ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে যোগ দেন এবং পরে বিভিন্ন সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেন:
- ১৯৯৪-১৯৯৭: সংস্কৃতিমন্ত্রী
- ১৯৯৪-২০০৪: রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান
- ২০০৮-২০২০: পার্লামেন্টের স্পিকার
- ২০০৫-২০০৭: সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি ও পারমাণবিক আলোচক
বর্তমান ভূমিকা ও সংকট মোকাবিলা
খামেনির মৃত্যুর পর লারিজানি ইরানের সবচেয়ে বড় সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছেন। তিনি অন্তর্বর্তী পর্ষদের পাশাপাশি নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণের দায়িত্বে আছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁকে আবার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে লারিজানির অবস্থান অনমনীয় হয়ে উঠেছে। তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন যে সংস্থাটির প্রতিবেদনগুলো 'আর কার্যকর নয়'।
কূটনৈতিক আলোচনা ও যুদ্ধের প্রভাব
কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও লারিজানিকে প্রায়ই বাস্তববাদী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বিশেষত ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে তাঁর সমর্থনের কারণে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় যুক্ত ছিলেন।
তবে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। লারিজানি সর্বশেষ ভাষণে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, 'সংবিধান অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।' তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরানকে অস্থিতিশীল করা যাবে না।
লারিজানি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন, 'আমাদের আঞ্চলিক দেশগুলোতে হামলা চালানোর কোনো ইচ্ছা নেই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু হবে।' তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে 'আগে কখনো দেখেনি এমন শক্তি' দিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
