মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চারটি বড় ধাক্কার আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চারটি বড় ধাক্কার আশঙ্কা

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, শিপিং রুট, বিমা ব্যয়, মুদ্রাবাজার ও বাণিজ্য প্রবাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য চারটি বড় ধাক্কা

আমদানি-নির্ভর জ্বালানি, মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাকনির্ভর রফতানি কাঠামোর কারণে বাংলাদেশও এই অভিঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে না। বরং জ্বালানি মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি ও রেমিট্যান্স—এই চার খাতেই তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে আস্থার সঞ্চার শুরু হয়েছিল, এই সংকট তা অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি ও বৈশ্বিক প্রভাব

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরে প্রবেশের একমাত্র সামুদ্রিক পথ। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি এই প্রণালি দিয়ে যায়। এর ৮০ শতাংশের বেশি সরবরাহ যায় এশিয়ায়, বিশেষ করে চীন, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া এই প্রণালির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ববাজারে তেলের দামে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।’’

জ্বালানি আমদানি ব্যয়ে বাংলাদেশের প্রথম ধাক্কা

বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬-৭ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার বাড়লে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৪০-৫০ কোটি ডলার। যদি দাম ২০-৩০ ডলার বাড়ে, তাহলে অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর সরাসরি প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়তে পারে, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হতে পারে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বাড়বে, আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হবে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে নতুন করে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি হবে।’’

রফতানি ও সরবরাহ চেইনের অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের রফতানির প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হবে। ছোট ও মাঝারি রফতানিকারকরা বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। যদি মধ্যপ্রাচ্য বা লোহিত সাগর রুট অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তবে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হতে পারে। এতে পরিবহন সময় ১০-১৫ দিন বাড়তে পারে এবং শিপিং খরচ ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

রেমিট্যান্স: দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নির্মাণ ও সেবা খাতে প্রকল্প স্থগিত হতে পারে। শ্রমিক প্রত্যাবাসনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। রেমিট্যান্স কমে গেলে রিজার্ভে চাপ বাড়বে এবং টাকার বিনিময় হার দুর্বল হতে পারে।

সম্ভাব্য সমাধান ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, সম্ভাব্য ধাক্কা মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রণোদনা বাড়ানো এবং খাদ্য ও জ্বালানি মজুত বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে প্রবাসী শ্রমবাজার ও জ্বালানি সরবরাহ অক্ষুণ্ন রাখতে সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা জরুরি হবে।