ইরানে মার্কিন হামলার পেছনে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের তদবির
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা এবং দেশটির ইসলামি শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে শনিবার শুরু হওয়া মার্কিন হামলার পেছনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে দুই আঞ্চলিক মিত্র ইসরায়েল ও সৌদি আরব। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই দুই দেশ জোরালো তদবির চালিয়েছে।
সৌদি আরবের দ্বিমুখী ভূমিকা
প্রকাশ্যে সৌদি আরব কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে কথা বললেও, গত এক মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একাধিকবার ফোন করে ইরানকে আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করেছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘকাল ধরে ইরানকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে মার্কিন হামলার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
সৌদি আরবের অবস্থান ছিল অত্যন্ত জটিল, কারণ তারা একদিকে ইরানের শিয়া নেতৃত্বের চরম বিরোধী, অন্যদিকে নিজ দেশের তেল স্থাপনায় ইরানি পাল্টা হামলার ভয় পাচ্ছিল। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি নেতারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এখনই আঘাত না করলে ইরান ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
আলোচনা ও হামলার মধ্যে দ্বন্দ্ব
মজার বিষয় হলো, যখন ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে জেনেভায় আলোচনা চালাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সৌদি আরব ও ইসরায়েল হামলার জন্য চাপ দিচ্ছিল। বৃহস্পতিবার জেনেভায় শেষ মুহূর্তের আলোচনায় মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা হয় যে, ইরান আলোচনার নামে কেবল সময়ক্ষেপণ করছে এবং গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে চাইছে।
শুক্রবার বিকেল থেকেই ট্রাম্পের সুর চড়তে শুরু করে। টেক্সাসে এক নির্বাচনি জনসভায় তিনি বলেন, "ইরানি আলোচকদের ওপর আমি খুশি নই। আমাদের সামনে একটি বড় এবং কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।" এরপরই তিনি ফ্লোরিডায় মার-এ-লাগো রিসোর্টে গিয়ে হামলার ভাষণ রেকর্ড করেন।
মার্কিন নীতির বড় বিচ্যুতি
শনিবারের এই হামলা কয়েক দশকের মার্কিন নীতি থেকে এক বড় বিচ্যুতি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি কোনো হুমকির কথা বলা হয়নি। তবুও ট্রাম্প ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকট এবং ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন ব্যারাকে বোমা হামলার ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে এই আক্রমণকে জায়েজ করার চেষ্টা করেছেন।
ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, "আগের কোনো প্রেসিডেন্ট যা করতে চাননি, আমি আজ রাতে তা করছি। আমি আপনাদের যা চেয়েছেন তা দিচ্ছি, এখন দেখুন আপনারা কী প্রতিক্রিয়া দেখান।" তিনি ঘোষণা করেছেন যে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী যেন শান্তিকামী মানুষের সঙ্গে মিলে দেশ পুনর্গঠনে কাজ করে।
হামলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
তবে প্রশ্ন উঠছে যে, কেবল আকাশপথের হামলা দিয়ে ইরানের মতো ৯০ মিলিয়ন মানুষের একটি দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব কিনা। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, কেবল বিমান শক্তি দিয়ে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বদলে দেওয়ার ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়।
এদিকে ডেমোক্র্যাটরা এই হামলার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এমন কী তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল যে এই হামলা চালাতে হলো? আমি তার উত্তর জানি না।" যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্য এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকবে।
