ইরানের ইসলামি বিপ্লব: ৪৭ বছরের শাসন, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস
ইরানের ইসলামি বিপ্লব: ৪৭ বছরের শাসন ও সংঘাত

ইরানের ইসলামি বিপ্লব: ৪৭ বছরের শাসন, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী পাহলভি রাজবংশের শাসনের অবসান ঘটে। ১৯৭৯ সালে দেশটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’ বা ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান’। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসলামি বিপ্লবী সরকার ইরান শাসন করছে। এই দীর্ঘ সময়ে তারা প্রতিবেশী ইরাকের সঙ্গে আট বছর যুদ্ধ করেছে, অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ সামাল দিয়েছে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছে।

১৯৭৯: ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

১৯৬৩ সালে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ‘হোয়াইট রেভোল্যুশন’ সংস্কারের বিরোধিতা করে গ্রেপ্তার হন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তাঁকে প্রথমে ইরাকের নাজাফে নির্বাসনে পাঠানো হয়, পরে ১৯৭৮ সালে ফ্রান্সে। সেখান থেকে খোমেনি অডিও বার্তা ও বক্তৃতার মাধ্যমে শাহবিরোধী আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ইরানে ফেরেন এবং গণভোটে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৯৭৯-১৯৮৮: মার্কিন দূতাবাস দখল ও ইরান-ইরাক যুদ্ধ

১৯৭৯ সালের নভেম্বরে শাহকে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করা হয়; ৫২ জন কূটনীতিককে প্রায় ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখা হয়। এর জেরে ইরানের ওপর প্রথম দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে ইরাকে আক্রমণ করেন ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। আট বছর ধরে এই যুদ্ধ চলে, যাতে দুই দেশের প্রায় ১০ লাখ মানুষ নিহত হন এবং ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। ১৯৮৮ সালের আগস্টে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

১৯৮২-১৯৯৫: আঞ্চলিক প্রভাব ও নিষেধাজ্ঞা

১৯৮২ সালে ইসরায়েলের লেবানন আক্রমণের পর ইরান শিয়া গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতে শুরু করে; পরবর্তী সময়ে ইরানের সমর্থনে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ গড়ে ওঠে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা হয়। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ তোলে যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাইছে, যার ফলে দেশটির তেল ও বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

২০০৩-২০১৫: পারমাণবিক কর্মসূচি ও চুক্তি

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করলে ইরান সেখানে শিয়া মিলিশিয়া ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়। ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একাধিক দফায় পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা দেয়। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় শক্তির সঙ্গে ইরান একটি পারমাণবিক চুক্তি করে, যা ইরান পরমাণু চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তি অনুযায়ী ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনে এবং বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

২০১৮-২০২৬: উত্তেজনা ও সংঘাত

২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন। ২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের কুদস বাহিনীর প্রধান কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। ২০২৪ সালে দামেস্কে ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েলি হামলা, প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়ার তেহরানে নিহত হওয়ার ঘটনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ে। ২০২৫ সালে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে দুই দেশের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী সংঘাত হয়। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চালায়, যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং দেশজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও আতঙ্ক তৈরি হয়।

ইরানের ৪৭ বছরের ইসলামি শাসন যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।