আয়াতুল্লাহ খামেনির জীবন: সোলাইমানির বন্ধু থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জীবন ছিল ঘটনাবহুল ও সংগ্রামমুখর। মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত তেহরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব ছিল, যা খামেনির রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পণ্ডিতের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন আলী খামেনি। তিনি নিজ শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা শুরু করেন, পরে শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে গমন করেন উচ্চতর শিক্ষার জন্য। ১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধাচরণকারী আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন।
তরুণ আলী খামেনি খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। তার নিজের ভাষায়, তিনি যা করেছেন এবং এখন যা বিশ্বাস করেন, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত। তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং বেশ কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন।
ইসলামি বিপ্লব ও রাজনৈতিক উত্থান
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর, আলী খামেনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে সংগঠিত করতে সহায়তা করেন। এই বিপ্লবী গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯৮১ সালের জুন মাসে, তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। এই ঘটনায় তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দুই মাস পর, একই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে। রাজাইয়ের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং আট বছর ধরে এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন
১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। যদিও তিনি সংবিধানে নির্ধারিত শিয়া ধর্মগুরুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদমর্যাদা বা 'গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ' উপাধি অর্জন করতে পারেননি। পরে ইরানের সংবিধানে সংশোধন আনা হয় এবং তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়।
ইরানের সংবিধানে তখন আরও একটি পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির হাতে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। নিজের শাসনামলে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ছয়জন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন।
প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে সম্পর্ক
১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সংস্কারপন্থি নেতা মোহাম্মদ খাতামি। খাতামি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সর্বোচ্চ নেতা খামেনি তার সংস্কার উদ্যোগে বাধা দেন। খাতামির পরে রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনঃ-নির্বাচন ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলনের জন্ম দেয়। সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ওই নির্বাচনের ফলাফল বৈধ বলে ঘোষণা দেন এবং তীব্র আন্দোলন দমনে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন।
পরমাণু চুক্তি ও অর্থনৈতিক সংকট
২০১৩ সালে ইরানের উদারপন্থি নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি করেন। এই চুক্তি খামেনির সম্মতিতেই সম্পন্ন হয়। তবে রুহানির নাগরিক অধিকার প্রসার ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগে বাধা দেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করে। রুহানি সেই চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন এবং ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়।
সোলাইমানি হত্যা ও প্রতিশোধ
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের মাটিতে একটি ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে। সোলেইমানি আয়াতুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। এই হামলার পর খামেনি সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।
খামেনি তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। শীর্ষ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ খামেনি বহুবারই ইসরাইল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি ইসরাইলকে 'একটি ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার' আখ্যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসরাইলকে মুছে ফেলার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
বিমান বিধ্বস্ত ও করোনাভাইরাস সংকট
২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ভুল করে ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান তেহরানের কাছে ভূপাতিত করে। এতে বিমানে থাকা ১৭৬ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার ফলে ইরানে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সে সময় শুক্রবারের জুমার নামাজের বিরল এক খুতবায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত। তবে তিনি তখন সামরিক বাহিনীর পক্ষই নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানের শত্রুরা এই ট্র্যাজেডিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।
ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে, ইরানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে। আয়াতুল্লাহ খামেনি প্রথমে করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করে দেখেছিলেন, বলেছিলেন যে ইরানের শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে।
খামেনির জীবন ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইসলামি বিপ্লব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবেলা পর্যন্ত তার নেতৃত্ব ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
