ট্রাম্পের বিদেশ নীতিতে আমূল পরিবর্তন: 'আমেরিকা ফার্স্ট' থেকে ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদেশ নীতিতে একটি বড় পালাবদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একসময় 'আমেরিকা ফার্স্ট' স্লোগান তুলে বিদেশে যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন তিনি ইরানের মতো দেশে সরকার পতনের চেষ্টা ও সামরিক অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন।
প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতা: ট্রাম্পের নীতির বিবর্তন
২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট পদে লড়াইয়ের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন একটি প্রমাণিত, সম্পূর্ণ ব্যর্থ নীতি।' তিনি বিদেশি সরকার উৎখাতে ছুটে বেড়ানো বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁর আমলে 'কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু হয়নি।' কিন্তু মাত্র এক বছর পর ট্রাম্প এখন ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে সেখানে সরকার পতনের চেষ্টা করছেন। গতকাল শনিবার ইরানে বোমা হামলা ছিল তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে অষ্টম সামরিক অভিযান।
ইরান হামলা: অভিযোগ ও অসংগতি
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় ইরানের বিরুদ্ধে অর্ধশতাব্দীর জমে থাকা অভিযোগ তুলে ধরেন। এর মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি, মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালানো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন এবং ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের মতো বিষয়গুলো ছিল। তবে কেন এই মুহূর্তে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো, আগে নয় কেন—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর তিনি দেননি। ইরানের হুমকি নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। গত গ্রীষ্মে তিনি দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি 'সম্পূর্ণ ধ্বংস' করা হয়েছে, কিন্তু এখন আবার হামলার প্রয়োজন কেন—তা ব্যাখ্যা করা হয়নি।
সরাসরি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান
ট্রাম্প এবার সরাসরি ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানিদের উদ্দেশে উসকানি দিয়ে তিনি বলেছেন, 'আমরা কাজ শেষ হলে আপনারাই আপনাদের সরকার দখল করুন।' গতকাল শনিবার তিনি দাবি করেন, হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন, যদিও ইরানিরা কীভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট নয়।
সমালোচনা ও সমর্থন: দুই দিকেই সাড়া
ক্যাটো ইনস্টিটিউটের গবেষক ব্রেন্ডান পি বাক বলেন, ২০১৬ সালে ট্রাম্প যে নীতির বিরুদ্ধে প্রচার করেছিলেন, এখন সেটিই তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য। সমালোচকেরা দ্রুত ট্রাম্পের পুরোনো বক্তব্য সামনে আনেন, যেমন ২০১২ সালে তিনি লিখেছিলেন, 'ওবামার জনপ্রিয়তা কমছে—দেখবেন তিনি লিবিয়া বা ইরানে হামলা করবেন।' অন্যদিকে, রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্লিন স্টুটজম্যান বলেন, ইরানে হামলা ভবিষ্যতের বড় হুমকি ঠেকাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহায়ক একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্যের পথ খুলে দেবে।
প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের পার্থক্য
ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এখন তিনি ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। প্রথম মেয়াদে যেসব সিদ্ধান্তে তিনি দ্বিধায় ছিলেন, এখন তা সহজেই নিচ্ছেন। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের দলে ছিলেন অভিজ্ঞ সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, যারা তাঁকে সংযত করতেন, কিন্তু এবার সেই ধরনের ব্যক্তিত্ব অনুপস্থিত।
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির ফল নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর। সফল হলে ভাঙা প্রতিশ্রুতিও ভোটাররা ভুলে যেতে পারেন। তেহরানের বর্তমান শাসনের জনপ্রিয়তা কম, এবং খামেনির মৃত্যুর খবরে রাস্তায় উল্লাসের ভিডিও দেখা গেছে। তবে আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে ট্রাম্প জড়াননি, বরং আকাশপথের শক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছেন। তবু মার্কিন সেনাদের হতাহতের আশঙ্কা রয়ে গেছে, এবং নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী হতে পারে কিংবা বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
