ইসরায়েলের 'বাইবেলিক অধিকার' নিয়ে হাকাবির বক্তব্যে মুসলিম বিশ্বের তীব্র প্রতিবাদ
হাকাবির বক্তব্যে মুসলিম বিশ্বের তীব্র প্রতিবাদ

ইসরায়েলের 'বাইবেলিক অধিকার' দাবি নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর ইসরায়েলের 'বাইবেলে বর্ণিত অধিকার' রয়েছে। এই মন্তব্যের ফলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের কয়েকটি মুসলিম দেশ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। দেশগুলো হাকাবির বক্তব্যকে 'বিপজ্জনক ও উসকানিমূলক' বলে অভিহিত করে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

হাকাবির দীর্ঘদিনের ইসরায়েল সমর্থন ও বাইবেলিক দাবি

ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচিত মাইক হাকাবি তাঁর রাজনৈতিক জীবনজুড়ে ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের দখলে থাকা ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে সাফাই গেয়ে আসছেন। অথচ ফিলিস্তিনিরা এই ভূখণ্ডকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অংশ মনে করে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনের বিপুল পরিমাণ ভূখণ্ড দখল করে নেয় ইসরায়েল এবং সেখানে বসতি স্থাপন শুরু করে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই বসতি স্থাপনকে অবৈধ বলে মনে করলেও, ইসরায়েল তাদের বাইবেল বর্ণিত ও ঐতিহাসিক অধিকারের দাবি করে চলেছে।

টাকার কার্লসনের সাক্ষাৎকারে হাকাবির বক্তব্য

গত বুধবার রক্ষণশীল মার্কিন টক শো উপস্থাপক টাকার কার্লসন ইসরায়েলে হাকাবির একটি সাক্ষাৎকার নেন, যা শুক্রবার সম্প্রচার করা হয়। সেখানে কার্লসন হাকাবির কাছে ইসরায়েলের টিকে থাকার অধিকার এবং প্রাচীন ভূমিতে ইহুদিদের শিকড়ের বিষয়ে জানতে চান। বাইবেলের 'জেনেসিস' বা আদিপুস্তকের বরাতে কার্লসন প্রশ্ন করেন, আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রের কি ফোরাত নদী থেকে নীল নদ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের ওপর অধিকার আছে, যা বাইবেল অনুযায়ী ঈশ্বর আব্রাহামকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন?

কার্লসনের প্রশ্নের জবাবে হাকাবি বলেন, 'তারা (ইসরায়েল) যদি এর পুরোটা নিয়ে নেয়, তবে তা দারুণ হবে। তবে আমি মনে করি না, আজ আমরা এখানে ঠিক সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি।' তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা সেই ভূমি নিয়ে কথা বলছি, যেখানে বর্তমানে ইসরায়েল রাষ্ট্র অবস্থিত এবং তারা শান্তিতে থাকতে চায়। তারা জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক বা অন্য কোথাও দখলদারির চেষ্টা করছে না, শুধু তাদের জনগণকে রক্ষা করতে চায়।'

মুসলিম দেশগুলোর যৌথ বিবৃতি ও প্রতিবাদ

হাকাবির এই মন্তব্যের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের এবং বিশ্বের কয়েকটি মুসলিম দেশ একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। এসব দেশের মধ্যে জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব, মিসর, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান অন্যতম। বিবৃতিতে দেশগুলো বলেছে, হাকাবির বক্তব্য 'বিপজ্জনক ও উসকানিমূলক' এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের নীতি ও জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন। পাশাপাশি, তারা এটিকে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রতিক্রিয়া

মার্কিন দূতাবাসের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, হাকাবির মন্তব্য মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না এবং তাঁর পুরো বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে ইসরায়েলের তার বর্তমান সীমানা পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছা নেই। অন্যদিকে, ইসরায়েলের কর্মকর্তারা হাকাবির সাক্ষাৎকার বা যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি, যা পরিস্থিতির জটিলতা বাড়িয়ে তুলছে।

এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের পটভূমিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে ধর্মীয় দাবি ও আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে উঠছে।