বাইবেলের দাবিতে ইসরাইলের মধ্যপ্রাচ্য অধিকার: মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে আরব বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া
বাইবেল দাবিতে ইসরাইলের অধিকার: মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে উত্তেজনা

বাইবেলীয় দাবিতে ইসরাইলের মধ্যপ্রাচ্য অধিকার: মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিতর্কিত মন্তব্য

ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি একটি সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অংশের ওপর ইসরাইলের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় অধিকার রয়েছে। রক্ষণশীল উপস্থাপক টাকার কার্লসনের সঙ্গে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে হাকাবির এমন অদ্ভুত মন্তব্য আরব ও মুসলিম বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

সাক্ষাৎকারে বাইবেলীয় ভূখণ্ডের দাবি

সাক্ষাৎকারে কার্লসন বাইবেল অনুযায়ী আব্রাহামের বংশধরদের জন্য প্রতিশ্রুত ভূমির কথা উল্লেখ করেন, যাতে বর্তমান সময়ের প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত। এর জবাবে হাকাবি বলেন, 'তারা (ইসরাইল) যদি এর পুরোটা নিয়ে নেয় তবে সেটি ভালোই হবে।' তবে তিনি পরবর্তীতে যোগ করেন যে ইসরাইল তার সীমানা বাড়াতে চাইছে না, বরং বর্তমান ভূমিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।

আরব বিশ্বের তীব্র নিন্দা ও প্রতিক্রিয়া

হাকাবির এই বক্তব্যের পরপরই সৌদি আরব, মিশর, জর্ডান, কুয়েত, ওমানসহ বিভিন্ন আরব দেশ এবং ওআইসি ও আরব লীগের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মন্তব্যকে 'চরমপন্থী বক্তব্য' এবং 'অগ্রহণযোগ্য' বলে অভিহিত করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে তাদের অবস্থানের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে।

অন্যদিকে, মিশর সরকার এই বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বা অন্য কোনো আরব ভূমির ওপর ইসরাইলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই। আরব লীগ সতর্ক করে বলেছে যে এ ধরনের ভিত্তিহীন মন্তব্য কেবল মানুষের ধর্মীয় ও জাতীয় আবেগকেই উসকে দেবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে পারে।

হাকাবির ব্যক্তিগত অবস্থান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মাইক হাকাবি একজন ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান হিসেবে পরিচিত এবং তিনি দীর্ঘকাল ধরে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সমস্যার 'দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান' বা টু-স্টেট সলিউশনের বিরোধিতা করে আসছেন। সাক্ষাৎকারে যখন কার্লসন বাইবেলের 'বুক অব জেনেসিস'-এর বরাত দিয়ে নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত ভূমির কথা বলেন (যার মধ্যে জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন, সৌদি আরব ও ইরাকের বড় অংশ পড়ে), তখন হাকাবি সহমত পোষণ করেন।

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরাইলের কোনো স্থায়ী সীমানা নেই এবং যুদ্ধের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে এই সীমানা পরিবর্তিত হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা দশকের পর দশক ধরে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে আসছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ সমর্থন করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও কূটনৈতিক উদ্বেগ

বর্তমানে গাজা ও লেবাননের সাথে চলমান উত্তেজনার মাঝে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এমন মন্তব্য ওই অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে জানিয়েছিলেন যে তিনি পশ্চিম তীর দখল বা অ্যানেক্সেশন সমর্থন করবেন না, তবুও হাকাবির এই 'বড় ইসরাইল' বা বাইবেলীয় ভূখণ্ডের দাবি কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ইসরাইল বা মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে এই বিতর্কিত বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে ধর্মীয় দাবিকে রাজনৈতিক অবস্থানে রূপান্তরের এমন প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।