সিরিয়ায় আলাউইত নারীদের উপর ভয়াবহ নির্যাতন: নিখোঁজ ৮০, অপহরণ ২৬
সিরিয়ায় আলাউইত নারীদের উপর নির্যাতন: নিখোঁজ ৮০

সিরিয়ায় সংখ্যালঘু আলাউইত নারীদের উপর ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু আলাউইত সম্প্রদায়ের নারীদের উপর চরম নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিবিসি অ্যারাবিক এই উদ্বেগজনক অবস্থার কথা তুলে ধরেছে।

নিখোঁজ ও অপহরণের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ে সিরিয়ায় অন্তত ৮০ জন নারী নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংগঠন 'সিরিয়ান ফেমিনিস্ট লবি' (এসএফএল) এই ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৬টি অপহরণের ঘটনা নিশ্চিত করেছে। নিখোঁজ ও অপহৃতদের প্রায় সবাই আলাউইত সম্প্রদায়ের সদস্য, যারা সিরিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ।

ভুক্তভোগীদের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা

নির্যাতনের শিকার নারীরা তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে জানিয়েছেন, শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাদের অপহরণ করা হয়েছে এবং যৌন দাসত্ব বা 'সাবায়া' হিসেবে ব্যবহারের হুমকি দেওয়া হয়েছে। রামিয়া (ছদ্মনাম) নামের এক কিশোরী জানান, তাকে তার গ্রাম থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড রুমে আটকে রাখা হয়। সেখানে বিক্রির উদ্দেশ্যে তার ছবি তোলা হয়।

অন্য এক ভুক্তভোগী নেসমা বলেন, তাকে সাত দিন আটকে রেখে বারবার ধর্ষণ করা হয়েছে। অপহরণকারীরা তাকে সরাসরি বলেছিল, 'আলাউইত নারীদের সৃষ্টিই করা হয়েছে দাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য'। এই বক্তব্য সম্প্রদায়টির প্রতি ঘৃণামূলক মনোভাবেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সরকারি বাহিনীর ভূমিকা ও অসহযোগিতা

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই ছিল আলাউইত বেসামরিক নাগরিক। সুন্নি ইসলামপন্থী নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী নারীরা অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা যখন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে গেছেন, তখন তাদের উপহাস করা হয়েছে কিংবা মামলা গ্রহণে সরাসরি অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। যদিও সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪২টি অপহরণের অভিযোগ তদন্ত করে দাবি করেছে, এর মধ্যে মাত্র একটি 'প্রকৃত অপহরণ' ছিল এবং বাকিগুলো পারিবারিক বিরোধ বা স্বেচ্ছায় পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা।

অপরাধীদের দায়মুক্তি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কতা

তবে এক নিরাপত্তা সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছে যে কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাই ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে এসব অপহরণে জড়িত ছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং এসএফএল-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, বর্তমানেও অন্তত ১৬ জন আলাউইত নারী নিখোঁজ রয়েছেন।

এই সংস্থাগুলোর মতে, অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে আলাউইত সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সম্প্রদায়টির নারীরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সিরিয়ার রাজনৈতিক উত্তরণের এই পর্যায়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি এই সহিংসতা দেশটির স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবিলম্বে এই নির্যাতন বন্ধের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।