উত্তর ইসরায়েলের কৌশলগত রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কর্তৃক আকস্মিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত রূপ ধারণ করেছে। ইরানের এই বিধ্বংসী অভিযানের পর তেল আবিব হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, বরং খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে এর একটি অত্যন্ত ‘কঠিন ও মারাত্মক জবাব দেবে’ ইসরাইল।
ইসরায়েলি সূত্রে পাল্টা হামলার পরিকল্পনা নিশ্চিত
রোববার গভীর রাতে ইসরায়েল লক্ষ্য করে ইরানের এই ভয়াবহ হামলার পরপরই ইসরাইলি সরকারের উচ্চপর্যায়ের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য দুটি পৃথক সূত্র মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে এই চাঞ্চল্যকর পাল্টা সামরিক পরিকল্পনার তথ্য নিশ্চিত করেছে। এদিকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যেকোনো মুহূর্তে অল-আউট বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় পূর্বসতর্কতা হিসেবে নিজেদের আকাশসীমা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিবৃতি
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান থেকে ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে অন্তত তিন দফায় ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্রের দাবি, তাদের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘এখন পর্যন্ত’ ইরানের ছোঁড়া প্রায় সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই নিখুঁতভাবে প্রতিহত বা ইন্টারসেপ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।
মার্কিন প্রযুক্তির সহায়তা
সিএনএন-এর প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সামরিক সূত্রের একজন দাবি করেছেন, মার্কিন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অন্তত ১০টি বড় ও দূরপাল্লার ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিতে আঘাত হানার আগেই মাঝআকাশে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে আইআরজিসি তাদের অনড় অবস্থানে থেকে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, উত্তর ইসরায়েলের হাইফা শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করেই এই নিখুঁত হামলা চালানো হয়েছে; কারণ এই ঘাঁটিটিই ছিল দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের বেসামরিক শহরতলিতে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর চালানো বর্বরোচিত ‘আগ্রাসনের মূল উৎস’।
ইরানের আকাশসীমা বন্ধ
ইসরায়েলের সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী ও বিমান হামলার আশঙ্কায় ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ’ জানিয়েছে, দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় সমস্ত আকাশসীমা বেসামরিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের জন্য পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু ইরানই নয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়াও সাময়িকভাবে তাদের নিজেদের আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে বলে দেশ দুটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মত
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে দূরপাল্লার বিমান হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাতে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী সাধারণত ভৌগোলিক সুবিধাজনক রুট হিসেবে ইরাক ও সিরিয়ার আকাশসীমা ব্যবহার করে থাকে; ফলে এই দুই দেশের আকাশসীমা লকডাউন করায় ইসরাইলের পাল্টা হামলার কৌশলগত পথ কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হবে।
আইআরজিসির হুঁশিয়ারি
আকাশসীমা বন্ধের পাশাপাশি আইআরজিসি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পুনরায় চূড়ান্ত হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের ওপর যদি নতুন করে কোনো আকাশ বা স্থল হামলা চালানো হয়, তবে এর পরবর্তী জবাব হবে আরও বহুগুণ ‘বড় পরিসরে’ এবং অল-আউট ধ্বংসাত্মক। তারা দাবি করে, ওয়াশিংটনের সাথে তাদের এই স্পষ্ট শর্তেই সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়েছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যের ‘সব ফ্রন্টে যুগপৎভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে’। কিন্তু লেবাননে অব্যাহত হামলা এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালি, ওমান সাগর ও ভারত মহাসাগরে ইরানের মূল ভূখণ্ডের উপকূল ও বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজগুলোতে বারবার চোরাগোপ্তা আক্রমণের মাধ্যমে মূলত মার্কিন-ইসরাইল জোটই প্রথম প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
মার্কিন নৌ-অবরোধ
উল্লেখ্য, শান্তি আলোচনা চলমান থাকা সত্ত্বেও মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কঠোর নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। আইআরজিসি বিবৃতিতে স্পষ্ট করে দিয়েছে, ‘রোববার রাতের এই অভিযানটি ছিল পশ্চিমাদের জন্য কেবল একটি প্রাথমিক সতর্কবার্তা মাত্র; যদি এই আগ্রাসনের ন্যূনতম পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে এর চূড়ান্ত জবাব হবে কল্পনাতীত ব্যাপক।’



