চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই দক্ষিণ ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং পারস্য উপসাগরে মাইন স্থাপনের চেষ্টায় নিয়োজিত স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে এই আত্মরক্ষামূলক হামলা চালানো হয়েছে।
হামলার বিবরণ ও প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক হামলা এমন এক সময়ে এল যখন দুই দেশের মধ্যে সংঘাত অবসানে কাতারের দোহায় কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল। মঙ্গলবারের (২৬ মে) বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, দক্ষিণ ইরানের কৌশলগত বন্দর নগরী এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি বন্দর আব্বাসের নিকটবর্তী এলাকায় এই সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হয়েছে। বন্দর আব্বাস শহরটি হরমুজ প্রণালীর প্রবেশদ্বারে অবস্থিত হওয়ায় এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল।
এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল যে বন্দর আব্বাসে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং স্থানীয় কর্মকর্তারা বিষয়টি তদন্ত করছেন। মার্কিন মুখপাত্র বলেন, চলমান যুদ্ধবিরতির সময়ে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর পাশাপাশি মার্কিন বাহিনী তাদের সৈন্যদের নিরাপত্তা রক্ষায় এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনার প্রভাব
এই হামলার বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি, তবে এটি চলমান শান্তি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সপ্তাহান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে বলে আভাস দিলেও, পরবর্তীতে তিনি তার আলোচকদের তাড়া না করার নির্দেশ দেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবারের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছিলেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন, অনেক বিষয়ে অগ্রগতি হলেও চুক্তি স্বাক্ষর এখনই আসন্ন—এমন দাবি কেউ করতে পারে না। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে মূলত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে।
গোয়েন্দা তথ্য ও পারমাণবিক ইস্যু
মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় আহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই বর্তমানে একটি অজ্ঞাত স্থানে অবস্থান করায় তার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা আলোচনার গতিকে মন্থর করছে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের অবরুদ্ধ তহবিল অবমুক্ত করা এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের মতো জটিল বিষয়গুলো চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পথে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল, যা দিয়ে সহজেই পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব। সোমবার রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, অথবা ইরানের মাটিতেই তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে।
সংঘাতের পটভূমি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়। পরবর্তীতে গত ৮ এপ্রিল থেকে উভয় পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি পালন করে আসছিল, যা এই নতুন হামলার মাধ্যমে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ল। সূত্র: বিবিসি



