কলম্বিয়ার বিশ্ববিখ্যাত গায়িকা, গীতিকার ও নৃত্যশিল্পী শাকিরা ইসাবেল মেবারাক রিপোল বিশ্বসঙ্গীতের অন্যতম বৃহৎ নাম। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি লাতিন মিউজিককে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তুলেছেন। তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ফিফা বিশ্বকাপের সাথে তার গভীর সম্পর্ক এবং স্মরণীয় থিম সং গুলো।
বিশ্বকাপের সঙ্গে শাকিরার সম্পর্কের সূচনা
শাকিরার বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ দিয়ে। সেই আসরের অফিসিয়াল গান ছিল ‘ওয়াকা ওয়াকা (দিস টাইম ফর আফ্রিকা)’ যা তিনি দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যান্ড ফ্রেশলিগ্রাউন্ডের সাথে গেয়েছিলেন। এই গানটি শুধু বিশ্বকাপের থিম সং-ই ছিল না, বরং ইতিহাসের অন্যতম সফল স্পোর্টস অ্যান্থেমে পরিণত হয়। স্টেডিয়ামের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে শাকিরার পারফরম্যান্স তাকে বিশ্বকাপের স্থায়ী প্রতীকে পরিণত করে। গানটির জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক ছিল যে এটি কোটি কোটি কপি বিক্রি হয় এবং বিশ্বজুড়ে চার্টের শীর্ষে অবস্থান করে।
একাধিক বিশ্বকাপে শাকিরার উপস্থিতি
শাকিরার বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্টতা শুধু একটি গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একাধিক আসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন:
- ২০০৬ বিশ্বকাপ (জার্মানি): শাকিরা বিশ্বকাপ ফাইনাল অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন। যদিও এটি কোনো অফিসিয়াল থিম সং ছিল না, তবে তার উপস্থিতি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময় থেকেই বিশ্বকাপের মঞ্চে তার পদচারণা শুরু হয়।
- ২০১০ বিশ্বকাপ (দক্ষিণ আফ্রিকা): অফিসিয়াল গান ‘ওয়াকা ওয়াকা (দিস টাইম ফর আফ্রিকা)’। এটি বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল গান হিসেবে বিবেচিত হয়।
- ২০১৪ বিশ্বকাপ (ব্রাজিল): অফিসিয়াল গান ‘লা লা লা’। এটি বিশ্বকাপের জন্য তার দ্বিতীয় অফিসিয়াল গান।
- ২০১৮ বিশ্বকাপ (রাশিয়া): অফিসিয়াল গান না হলেও উদ্বোধনী ও প্রমোশনাল পারফরম্যান্সে যুক্ত ছিলেন।
অর্থাৎ, শাকিরা অন্তত তিনটি বিশ্বকাপে (২০০৬, ২০১০, ২০১৪) সরাসরি বড় ভূমিকা রেখেছেন এবং দুটি বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান তার কণ্ঠে এসেছে।
বিশ্বকাপের সংগীতে শাকিরার প্রভাব
শাকিরা বিশ্বকাপ সংগীতকে শুধু বিনোদন নয়, বরং একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ভাষায় পরিণত করেছেন। তার গানগুলোতে বিশ্ব ঐক্যের বার্তা, আফ্রিকান ও লাতিন রিদমের মিশ্রণ, খেলাধুলার উদ্দীপনা ও আবেগ ফুটে ওঠে। উল্লেখ্য, ‘ওয়াকা ওয়াকা’ আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত ও সর্বাধিক দেখা গানগুলোর একটি।
শাকিরার সঙ্গীত জগতে যাত্রা ও উত্থান
শাকিরার জন্ম ১৯৭৭ সালে কলম্বিয়ার বারানকিয়ায়। তার পুরো নাম শাকিরা ইসাবেল মেবারাক রিপোল। ছোটবেলা থেকেই তিনি কবিতা লেখা ও গান তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন এবং কাজ শুরু করেন। তবে শুরুটা কঠিন ছিল; প্রথম দুটি অ্যালবাম বাণিজ্যিকভাবে খুব সফল হয়নি। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ১৯৯৫ সালে তার অ্যালবাম ‘পিজ ডেসকালসোস’ তাকে লাতিন আমেরিকায় সুপারস্টার বানায়। এরপর ‘হোয়েনেভার, হোয়েরেভার’ (২০০১) গানটি তাকে বিশ্ববাজারে পরিচিত করে। ‘হিপস ডোন্ট লাই’ (২০০৬) তার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক হিটগুলোর একটি হয়ে ওঠে। এই সময় থেকেই শাকিরা লাতিন মিউজিককে মূলধারার পপ সংস্কৃতিতে শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসেন।
শাকিরার বর্তমান অবস্থান
আজ শাকিরা শুধু একজন গায়িকা নন—তিনি একজন বৈশ্বিক আইকন। ২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরেও তিনি নতুন গান ও পারফরম্যান্স দিয়ে আলোচনায় এসেছেন, যা তার বিশ্বকাপ যাত্রার ধারাবাহিকতাকে আরও শক্তিশালী করছে। আসন্ন বিশ্বকাপের জন্য শাকিরার সবচেয়ে আলোচিত গান হলো ‘দাই দাই’, যা তিনি নাইজেরিয়ার শিল্পী বার্না বয়-এর সাথে গেয়েছেন এবং এটি টুর্নামেন্টের অফিসিয়াল থিম সং হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এই গানটি আফ্রো-বিটস ও লাতিন পপের মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বিশ্বকাপের ‘গ্লোবাল ইউনিটি’ থিম ফুটে ওঠে। গানের মধ্যে ফুটবল উন্মাদনা, বিভিন্ন দেশের নাম এবং উৎসবের মতো এনার্জি রাখা হয়েছে, যা স্টেডিয়ামের আমেজ ও উন্মাদনা তৈরি করে।
শাকিরার গল্প শুধু সংগীতের সাফল্যের গল্প নয়—এটি একজন শিল্পীর বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প। বিশ্বকাপের সঙ্গে তার সম্পর্ক তাকে ‘ফুটবলের সুর’ হিসেবে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।



