যুক্তরাষ্ট্র জার্মানি থেকে প্রায় পাঁচ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। শুক্রবার মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যের জেরে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মের্ৎসের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া
সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সঙ্গে তীব্র বাগ্বিতণ্ডার পর ট্রাম্প জার্মানি থেকে সেনা কমানোর হুমকি দিয়েছিলেন। গত সোমবার মের্ৎস মন্তব্য করেন যে ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র 'অপদস্থ' হচ্ছে এবং তিনি ওয়াশিংটনের কৌশল বুঝতে পারছেন না। পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জার্মানির সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো 'ভুল ও অকাজের'। তিনি আরও বলেন, 'এ ধরনের অসহযোগিতাপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট সঠিক পদক্ষেপই নিচ্ছেন।'
সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা ও প্রভাব
পেন্টাগন জানিয়েছে, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে। বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩৫ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা ইউরোপের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপে মার্কিন সেনা সংখ্যা ২০২২ সালের পূর্বের স্তরে ফিরে যাবে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেনা সংখ্যা বাড়িয়েছিলেন।
ইউরোপের নিরাপত্তা দায়িত্ব
ট্রাম্প প্রশাসন চায় ইউরোপ নিজেই নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব বেশি করে নিক। এই সিদ্ধান্ত সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই অংশ। তবে এটি স্পষ্ট করে যে মিত্রদেশগুলোকে 'অবিশ্বস্ত' মনে করলে ট্রাম্প কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ই-মেইলের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে রয়টার্স এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানায়, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে না থাকা দেশগুলোকে শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে স্পেনকে ন্যাটো থেকে সাময়িক বাদ দেওয়া এবং ফকল্যান্ড দ্বীপের মালিকানা নিয়ে যুক্তরাজ্যের দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনার কথা রয়েছে।
অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের প্রতি হুমকি
ইউরোপ থেকে আরও মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ইতালি ও স্পেন থেকে সেনা সরানোর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'সম্ভবত'। গত মাসে তিনি হুমকি দেন যে স্পেন যদি ইরানে হামলার জন্য তাদের ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দেয়, তাহলে তিনি স্পেনের ওপর পূর্ণ বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করতে পারেন। স্পেনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—নেভাল স্টেশন রোটা ও মোরন বিমানঘাঁটি।
মেলোনির সঙ্গেও বিরোধ
ট্রাম্প তার মিত্র ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গেও বিরোধে জড়িয়েছেন। ইরানে যুদ্ধ চালানো এবং পোপ লিওকে নিয়ে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক মন্তব্যের বিষয়ে মেলোনি ক্ষোভ প্রকাশ করার পর এই বিরোধ শুরু হয়। গত মাসে ট্রাম্প বলেন, মেলোনি সাহস হারিয়েছেন এবং ওয়াশিংটনকে হতাশ করেছেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমালোচনা
ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদেরও সমালোচনা করেছেন, কারণ তারা পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি খুলতে সাহায্য করার জন্য ওই অঞ্চলে নৌবাহিনী পাঠায়নি। এই পথটি বিশ্বজুড়ে তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তেহরান এই জলপথ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে বাজারে বিশৃঙ্খলা এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।



