ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী হত্যায় গ্রেপ্তার সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে আগেও সহিংসতার অভিযোগ
ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী হত্যায় গ্রেপ্তার সন্দেহভাজনের আগেও সহিংসতা

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিশাম আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে তিন বছর আগে তাঁর মা ও ভাইয়ের ঘটে যাওয়া একটি সহিংসতার ঘটনা পরিবারের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছিল। পরিবার তখন তাঁর আচরণকে ‘উদ্ভট’ বা ‘অস্বাভাবিক’ বলে অভিহিত করেছিল।

সহিংসতার ঘটনা

সিএনএনের হাতে আসা পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৯ মে এক ঘটনার সময় আবুঘরবেহ তাঁর ‘অস্বাভাবিক আচরণের’ বিষয় নিয়ে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় তাঁর ভাই আবুঘরবেহর আচরণের ভিডিও রেকর্ড করতে শুরু করেন। তখন তিনি ভাইকে ঘুষি মারেন। এতে তাঁর ভাই মাটিতে পড়ে যান।

পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘটনার সময় আবুঘরবেহ তাঁর মায়ের পিঠেও লাথি মেরেছিলেন, যার ফলে তিনিও পড়ে গিয়েছিলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অতীত আচরণের রূপরেখা

পুলিশের প্রতিবেদনে আবুঘরবেহর অতীত আচরণের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। পরে তাঁর বিরুদ্ধে রুমমেট জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে (দুজনই ২৭ বছর বয়সী) হত্যার অভিযোগ আনা হয়। তাঁরা দুজনই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন। আবুঘরবেহও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

লিমন ও বৃষ্টিকে শেষবার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে টাম্পায় দেখা গিয়েছিল। এক সপ্তাহ পর একটি সেতুর ওপর লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের ধারণা, বৃষ্টিকেও হত্যা করা হয়েছে। পরে লিমনের যেখানে মরদেহ পাওয়া গেছে, সেখান থেকে কিছুটা দূরে মানুষের দেহাবশেষের আরেকটি অংশ পাওয়া যায়। তবে সেটি বৃষ্টির কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে সর্বশেষ একটি ফৌজদারি মামলার হলফনামা অনুযায়ী জানা যায়, ২৬ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের দক্ষিণে একটি মরদেহ (খণ্ডিত অংশ) উদ্ধার করা হয়। ওই মরদেহের খণ্ডিত অংশে জড়ানো পোশাকের সঙ্গে সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজে শেষবার নাহিদা বৃষ্টিকে দেখা যাওয়ার সময় তাঁর পরনে থাকা পোশাকের মিল রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবুঘরবেহর বিবৃতি

২০২৩ সালে বাড়ির সেই ঘটনার পর হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আবুঘরবেহ দাবি করেছিলেন, ‘আমিই আমার ভাইকে সৃষ্টি করেছি। আমিই তাঁর ঈশ্বর। এখানে এটিই আমার প্রথম জীবন।’

তখন আবুঘরবেহকে শারীরিকভাবে আঘাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন তাঁকে ‘বেকার অ্যাক্ট’-এর আওতায় নেওয়া হয়েছিল। ফ্লোরিডার এই আইন অনুযায়ী, মানসিক অসুস্থতার কারণে কেউ যদি নিজের বা অন্যদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন, তাহলে তাঁকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে রাখা যায়।

আদালতে হাজিরা

ফ্লোরিডার টাম্পায় হিশাম আবুঘরবেহ ভিডিও কলের মাধ্যমে আদালতে হাজিরা দেন। তাঁর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার হত্যার দুটি মামলা করা হয়েছে—ডব্লিউএফটিএস টিভি

পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর পরিবারের এক সদস্য পুলিশকে জানিয়েছিলেন, আবুঘরবেহর মানসিক কোনো রোগ ধরা না পড়লেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় তাঁর আচরণ আরও খারাপ হচ্ছিল।

আত্মীয়ের চিঠি

আদালতে জমা দেওয়া ভুক্তভোগীর ওপর প্রভাবসংক্রান্ত এক চিঠিতে এক আত্মীয় লিখেছেন, কয়েক বছর আগে ওষুধ হিসেবে গাঁজার ব্যবহার শুরু করার পর আবুঘরবেহর আচরণ বদলে গিয়েছিল।

ওই আত্মীয় লিখেছেন, হিশাম আগে খুব ভালো ছেলে ছিলেন। বড় ছেলে হিসেবে তিনি খুবই সাহায্যকারী ও সহায়ক ছিলেন। কিন্তু ‘ওষুধ’ তাঁকে মানসিক অসুস্থতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর মধ্যে ক্ষতিকর আচরণ ও রাগের সমস্যা তৈরি করেছে।

আবুঘরবেহর মধ্যে এই দৃশ্যমান পরিবর্তন সত্ত্বেও তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনায় ওই আত্মীয় ‘স্তম্ভিত’ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর মাদকাসক্তির চিকিৎসার জন্য তাঁরা একটি আবেদন করেছিলেন।

ওই আত্মীয় লিখেছেন, ‘আমি আশা করি, আদালত হিশামকে সাহায্য করবেন এবং তাঁকে চিকিৎসার আওতায় আনার ব্যবস্থা করবেন। ওষুধ হিসেবে তাঁর গাঁজার ব্যবহার বন্ধ করবেন। কারণ, এই চিকিৎসা আসলে তাঁর জন্য নয়। তাঁর এমন কোনো রোগ নেই, যার জন্য ওষুধ হিসেবে “মাদক” ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে।’

আদালতের রেকর্ড

আদালতের রেকর্ড অনুযায়ী, আগের সেই শারীরিকভাবে আঘাতের মামলাটি পরবর্তীকালে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তবে একজন বিচারক একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, যার ফলে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত আবুঘরবেহ তাঁর ভাই বা তাঁদের বাড়ির কাছে যেতে পারতেন না।

এখন ২৬ বছর বয়সী আবুঘরবেহ ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার সেই দুই শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।

প্রসিকিউটরদের অভিযোগ

প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটির কাছে বেশ কিছু প্রশ্ন করেছিলেন, যার মধ্যে একটি ছিল, মানুষের দেহ কীভাবে ডাস্টবিনে রাখা যায়।

এ ছাড়া নিখোঁজ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে আবুঘরবেহ অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ, আবর্জনার ব্যাগ, লাইটার ফুয়েল ও কাঠকয়লা কেনার অর্ডার করেছিলেন। অপরাধের হলফনামায় উল্লেখ করা আর্থিক রেকর্ড অনুযায়ী ১৫ এপ্রিল অ্যামাজন থেকে তাঁর কাছে নকল দাড়িও পাঠানো হয়েছিল।