মার্কিন সিনেটে ইসরায়েলের সামরিক সহায়তা বন্ধে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক ভোট
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ এপ্রিল মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ইসরায়েলের জন্য সামরিক সহায়তা পাঠানোর প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। যদিও এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি, তবে এই ভোট মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রতি দ্বি-দলীয় সমর্থনের দীর্ঘদিনের কাঠামোয় বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে।
ভোটাভুটির বিবরণ
ভোটাভুটিতে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর জন্য ২৯৫ মিলিয়ন ডলারের ডি৯ ক্যাটারপিলার বুলডোজার পাঠানোর প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ৪০ জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা। দলের ককাসের প্রায় সবাই অর্থাৎ সাতজন বাদে বাকিরা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। অন্য একটি ভোটাভুটিতে ১২ হাজারটি ১ হাজার পাউন্ডের বোমা ইসরায়েলের কাছে বিক্রির ১৫১.৮ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন ৩৬ জন ডেমোক্র্যাট।
যদিও এই পদক্ষেপগুলো ব্যর্থ হয়েছে (যথাক্রমে ৪০-৫৯ এবং ৩৬-৬৩ ভোটে), তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটদের মানসিকতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা
২০২৪ সাল থেকে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের নেতৃত্বে এর আগেও তিনটি প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু এবার বিরোধীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। নিউ জার্সির সিনেটর কোরি বুকার এবং অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলি ও রুবেন গ্যালেগোর মতো ইসরায়েলপন্থি হিসেবে পরিচিত মধ্যপন্থি এবং ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরাও এবার পরিবর্তনের পক্ষে সুর মিলিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের প্রগতিশীল পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট ডাস বলেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মূলধারার অবস্থান এখন ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধ করা।
সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা যখন এই প্রচেষ্টা শুরু করেছিলাম, তখন মাত্র ১১টি ভোট পেয়েছিলাম। এখন সেটি ৪০-এ দাঁড়িয়েছে।
গাজা যুদ্ধের প্রভাব
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এবং বাইডেন প্রশাসনের অটল সমর্থনের সমালোচনা চলছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু।
উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনীর কমব্যাট পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলি ভোটের পর বলেন, আমরা সবাই দেখছি এখন অঞ্চলে কী ঘটছে। এটি স্বাভাবিক কোনও ঘটনা নয় এবং এটি আমাদের নিরাপদ করছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কোনও স্পষ্ট লক্ষ্য বা কৌশল ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।
পেন্টাগনে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মিশিগানের এলিসা স্লটকিন জানান, অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব ঠেকাতে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তার জন্য কঠিন ছিল।
রাজনৈতিক প্রভাব
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক এখন অনেক মার্কিন রাজনীতিকের জন্য রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পরাজয়ের পেছনে ইসরায়েলকে নিয়ে দলের অস্পষ্ট অবস্থান একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে, ইসরায়েলের সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করায় ভোটারদের কাছ থেকে নেতিবাচক সাড়া পেয়েছেন তৎকালীন প্রার্থী কমলা হ্যারিস।
জনমতের পরিবর্তন
গ্যালাপের ফেব্রুয়ারি মাসের জরিপ অনুযায়ী, আমেরিকানদের মধ্যে ইসরায়েলের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মিতা (৪১ শতাংশ) বেশি, যেখানে ইসরায়েলের পক্ষে ছিল ৩৬ শতাংশ। এপ্রিলে পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, রেকর্ড ৬০ শতাংশ আমেরিকান ইসরায়েলকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর প্রতি অপছন্দের হার ৫২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৯ শতাংশ হয়েছে।
এই বাস্তবতায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চিফ অব স্টাফ এবং ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রাম ইমানুয়েল এইচবিও-র রিয়েল টাইম উইথ বিল মাহের-এ বলেন, ‘আপনারা (ইসরায়েল) অন্য মিত্রদের মতো (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটেন, জার্মানি)। আপনারা যা কিনতে চান কিনতে পারেন, কিন্তু নিয়ম মেনে চলতে হবে।’
এআইপিএসির প্রতিক্রিয়া
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপিএসি) ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠে নেমেছে। তারা ইসরায়েলে অর্থায়ন বিরোধীদের টার্গেট করছে। ইলিনয়ে হাউস ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে এআইপিএসি সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ১ কোটি ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি খরচ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সাবেক মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য দূত ডেনিস রস মনে করেন, ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের পতন বা পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকারের দায়িত্ব হবে গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা পুনরায় নিশ্চিত করা।’
ইসরায়েলের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক পরিচালক আভনার গোলভ বলেন, ‘এমন এক সময়ে যখন মার্কিন-ইসরায়েল সহযোগিতা তুঙ্গে, তখন ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমে আসাটা উদ্বেগজনক।’ তবে তিনি স্বীকার করেন যে, দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প, বিশেষ করে মিসাইল ডিফেন্স ও ড্রোন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একে অপরের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, এই সম্পর্ক ছিন্ন করা সহজ নয়।
২০২৬ সালের মার্কিন প্রতিরক্ষা আইনে আয়রন ডোম, অ্যারো ও ডেভিড’স স্লিং-এর মতো সিস্টেমের জন্য ৫০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গোলভের মতে, ‘ইসরায়েলি প্রযুক্তির ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয়বহুল গবেষণা ও উন্নয়ন ধাপ এড়িয়ে আধুনিক যুদ্ধের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।’
সূত্র: আল মনিটর



