ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিলেও পরবর্তীতে 'গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা' চলায় তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তবে ইরানিরা সম্ভাব্য নতুন হামলার জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তারা ইঙ্গিত দিয়েছে যে তাদের ওপর হামলা চালানো হলে প্রতিবেশী দেশগুলো ও বিশ্ব অর্থনীতির কাছ থেকে চরম মূল্য আদায় করা হবে।
ইরানের আশঙ্কা ও প্রস্তুতি
চিন্তন প্রতিষ্ঠান 'জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স'-এর ইরান বিষয়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হামিদ রেজা আজিজি জানান, চলতি বছরের প্রথম দফার যুদ্ধে ইরানিরা প্রায় তিন মাসের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ফলে ইসরাইল ও আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুগুলোর বিরুদ্ধে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে হামলা চালানোর জন্য ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার সীমিত রেখেছিল।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। আজিজির মতে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানি নেতারা ধারণা করছেন যে লড়াই হবে 'স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত তীব্র'। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সমন্বিত ও ভারী হামলা চালানো হতে পারে। তিনি ইরানের সরকার ঘনিষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রকাশ্য মন্তব্য পর্যবেক্ষণ করে আসছেন।
পাল্টা আঘাতের কৌশল
হামিদ রেজা আজিজি বলেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরান প্রতিদিন কয়েক ডজন থেকে কয়েক শ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে, যা শত্রুকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করবে এবং প্রতিপক্ষের হিসাব-নিকাশ বদলে দেবে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর তীব্র হামলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্র, শোধনাগার ও বন্দরগুলোয় আঘাত হানা বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করা এবং ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি।
যদি ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হয়, তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো যুদ্ধে আরও জড়িয়ে পড়তে পারে, যদিও উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক নেতাই এ পরিস্থিতি এড়াতে চান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানি কর্মকর্তা ও সরকারঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকেরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে তীব্র হুমকি দিচ্ছেন, কারণ আমিরাত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনা পরিচালনার সুযোগ দিয়ে ইরানের ওপর হামলায় সাহায্য করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন-ইসরাইলি হামলার সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব গোপনে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতামত
ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক মেহেদি খারাতিয়ান গত মাসে এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমাদের অবশ্যই আমিরাতকে উটে চড়ার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং আমরা তা করতে পারি। প্রয়োজন হলে আমরা আবুধাবি দখল করব।' আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আলী আলফোনেহ এক ই-মেইলে বলেছেন, এসব বক্তব্য যতই অতিরঞ্জিত হোক, তা ইরানের ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ নেতৃত্বের 'গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাধারাকে প্রতিফলিত করে'।
আলফোনেহ সম্ভাব্য সৌদি-ইরান অনাক্রমণ চুক্তির (নন-অ্যাগ্রেশন প্যাক্ট) খবরকে 'সম্পূর্ণ অবাস্তব' বলে নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, তেল উৎপাদনকারী বড় দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলার হুমকিই এখনো ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ সংযত রাখার হাতে গোনা কয়েকটি নিয়ামকের একটি।
ইরানের হাতে অন্যান্য 'কার্ড'
ইরান বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। এটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথ, যা দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের ১০ ভাগের ১ ভাগ পরিবহন করা হয়। সমুদ্রপথটি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হুতিদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের পাশেই অবস্থিত। গত দফার লড়াইয়ে ইরানিরা হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থান কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
হামিদ রেজা আজিজি বলেন, ইরান সরকার যদি মনে করে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ সংকটের মুখে পড়েছে, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটির পরিবর্তে দুটি সামুদ্রিক ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে বাধ্য করতে চাইতে পারে। মেহেদি খারাতিয়ান গত মাসে পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে আঘাত হানে, তবে ইরান বাব আল-মান্দেবে জাহাজ চলাচল সীমিত করে পাল্টা জবাব দেবে। এতে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বজায় থাকলেও কৌশলটি শেষ পর্যন্ত জটিলতায় পড়তে পারে।
হুতিদের ভূমিকা
আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হলে হুতি মিলিশিয়ারা ইরানকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছে। তবে গত দফার লড়াইয়ে তারা সতর্ক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, গোষ্ঠীটি তাদের ফুরিয়ে আসা সামরিক মজুত থেকে ঠিক কতটুকু ব্যবহার করতে পারবে, তা হিসাব-নিকাশ করছে।



