ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার তিন মাস পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু সংকট কাটানোর কোনো লক্ষণ নেই; বরং মার্কিন অবরোধ ও হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি চরম অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। কোনো পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নয়। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে, এবং যেকোনো মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা
নীতিবিশ্লেষকদের মতে, এখন প্রধান উদ্বেগ চুক্তি না হওয়া নয়, বরং ওয়াশিংটন বা তেহরানের কোনো ভুল হিসাবের কারণে উত্তেজনা আরেকটি বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে ইরানের ওপর নতুন সামরিক হামলার দাবি জোরালো হচ্ছে। কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, চাপ বাড়ালে তেহরান দুর্বল হবে এবং আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হবে।
বিরোধিতা ও বাস্তবতা
তবে এই তত্ত্বের তীব্র বিরোধিতা করেছেন ইসরাইলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ। তিনি বলেন, অতীতেও চাপ প্রয়োগের কৌশল পরীক্ষা করা হয়েছে, কিন্তু ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করেনি। আঞ্চলিক এক সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, তারা একটি ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে দিন দিন নতুন মার্কিন-ইসরাইলি হামলার সম্ভাবনা বাড়ছে।
ইরানের অবস্থান ও আলোচনা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক সক্ষমতা ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কেবল নীতি নয়, বরং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকার আদর্শিক ভিত্তি মনে করে। তাদের মতে, এসব ছেড়ে দেওয়া মানে সমঝোতা নয়, আত্মসমর্পণ। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কয়েক দফা পরোক্ষ আলোচনা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। দুই পক্ষের প্রত্যাশার ব্যবধান আকাশচুম্বী।
মার্কিন ও ইরানি দাবি
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান আগামী ২০ বছর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক এবং সব মজুত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিক। অন্যদিকে ইরান চায় হামলার স্থায়ী অবসান, নিরাপত্তার গ্যারান্টি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি। কিন্তু ওয়াশিংটন সরাসরি ইরানের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সময় ফুরিয়ে আসছে। দ্রুত চুক্তি না করলে ইরানের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না এবং তাদের খুব খারাপ সময় পার করতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ বলেন, কোনো পক্ষই চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে রাজি নয়। উভয় পক্ষই মনে করছে সময় তাদের পক্ষে, যা চুক্তিকে অসম্ভব করে তুলছে।
বৈশ্বিক প্রভাব
ফলস্বরূপ, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কেন্দ্র করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের ২৫ শতাংশ ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে এটি প্রায় বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র কর্মকর্তা অ্যালান আয়ার বলেন, এই দুই পক্ষ কখনোই চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে না। ট্রাম্প শুধু জিততে চান না, তিনি ইরানকে অপমান করতে চান এবং দেখাতে চান যে তিনি ইরানকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন।



