কয়েক দশক ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত ‘ডেথ রেলওয়ে’ বা মৃত্যু রেলপথের একটি স্টেশন হঠাৎ মাটির ওপরে ভেসে উঠেছে। থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি প্রদেশের বাজিরালংকর্ন বাঁধের একটি জলাধার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সম্প্রতি পানি নিষ্কাশন করা হলে দৃশ্যমান হয় ঐতিহাসিক নিথে স্টেশন। এই বিরল সুযোগে স্টেশনটির অবশিষ্টাংশ এবং যুদ্ধকালীন বিভিন্ন স্মারক নিয়ে গবেষণার জন্য সেখানে ছুটে যাচ্ছেন গবেষকেরা।
ডেথ রেলওয়ের ইতিহাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দখলের পর নিজেদের রসদ সরবরাহের রুট হিসেবে থাইল্যান্ড (তৎকালীন শ্যাম) এবং মিয়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) মধ্যে এই ৪১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি তৈরি করেছিল জাপানি বাহিনী। এটি নির্মাণে বাধ্য করা হয়েছিল প্রায় ৬০ হাজার মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবন্দি এবং লাখ লাখ এশীয় শ্রমিককে, যাদের জাপানিরা ‘রমিউশা’ বলত।
প্রচণ্ড গরমে অমানুষিক খাটুনির ফলে ১৩ হাজারের বেশি যুদ্ধবন্দি এবং ৭৫ হাজারেরও বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল এই রেলপথ তৈরিতে। এই কারণেই এর নাম হয় ‘ডেথ রেলওয়ে’। এই ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে ১৯৫৭ সালে ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’, ২০১৩ সালে ‘দ্য রেলওয়ে ম্যান’ সিনেমা এবং ২০২৫ সালে একটি মিনি সিরিজও নির্মিত হয়েছে।
গবেষকদের তৎপরতা
জলাধারের পানি কমে যাওয়ায় এবারই প্রথম স্টেশনের অবকাঠামো ও নকশা এত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি অস্ট্রেলীয় স্বাধীন গবেষক মার্টিন ফ্রায়ার। সিঙ্গাপুরে বন্দি হওয়া তার দাদাও এই রেলপথে কাজ করতে গিয়ে মারা যান। ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে কাদা মাড়িয়ে ফ্রায়ার মেটাল ডিটেক্টরের সাহায্যে লাইনের লোহার পেরেক ও সেতুর যন্ত্রাংশের মতো যুদ্ধের নানা স্মারক খুঁজে পেয়েছেন। লন্ডনের ন্যাশনাল আর্কাইভের যুদ্ধকালীন আকাশচিত্র এবং থাইল্যান্ড-বার্মা রেলওয়ে সেন্টারের গবেষক অ্যান্ড্রু স্নো-র আনা হাতে আঁকা মানচিত্র মিলিয়ে তারা তৎকালীন যুদ্ধবন্দি শিবিরের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
দর্শনার্থীদের ভিড়
ঐতিহাসিক এই স্টেশনটি দেখার জন্য থাইল্যান্ডের শত শত দর্শনার্থী সেখানে ভিড় করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সী কিট্টি লাওখাম স্টেশনটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার পর তা ৩ কোটি ২০ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে। সেই ভিডিও দেখে ব্যাংকক থেকে ৩৫০ কিলোমিটার পথ মোটরবাইক চালিয়ে নিথে স্টেশনে এসেছেন চান্নারং নোইমালা। তিনি বলেন, ‘শ্রমিক বা যুদ্ধবন্দি যারাই এখানে মারা গেছেন, অন্তত আমরা তাদের স্মরণ করতে পারছি।’
তবে গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীদের হাতে সময় খুবই কম। আগামী আগস্টের মধ্যে বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ শেষ হওয়া এবং বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার কারণে জলাধারটি আবার পানিতে ভরে যাবে।
হেলফায়ার পাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
নিথে স্টেশন থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের একটি নৃশংস অংশ রয়েছে, যা ‘হেলফায়ার পাস’ নামে পরিচিত। সেখানে শত শত যুদ্ধবন্দি মারা গিয়েছিলেন। অস্ট্রেলীয় সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত সেখানকার একটি কেন্দ্রে গত বছর রেকর্ড ১ লাখ ৬৯ হাজার দর্শনার্থী এসেছেন। কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক ও অস্ট্রেলীয় সেনা কর্মকর্তা মিক ক্লার্ক বলেন, ‘সময় যত গড়াচ্ছে, এই স্থানগুলোর গুরুত্ব তত বাড়ছে। এগুলো যুদ্ধের নির্মম ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝতে সাহায্য করে।’
সূত্র: এপি



