জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়াকামালপুর সীমান্তে ষষ্ঠী বর্মণ নামে এক ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানো নিয়ে বিএসএফ ও বিজিবি সদস্যের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
দেশভাগের কয়েক বছর পর ভারত ও পাকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, শুধু সাধারণ বন্দী নয়, মানসিক হাসপাতালে থাকা রোগীদেরও দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই কালজয়ী লেখক সাদত হাসান মান্টো লিখেছিলেন এক ধ্রুপদি গল্প ‘টোবা টেক সিং’।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিষণ সিং। বহু বছর ধরে পাগলাগারদে থাকা এই মানুষটি সবার কাছে একটাই প্রশ্ন করতেন, ‘টোবা টেক সিং কোথায়? পাকিস্তানে, নাকি হিন্দুস্তানে?’ কারণ, টোবা টেক সিং ছিল তাঁর গাঁ, তাঁর পরিচয়, তাঁর শিকড়।
যেদিন তাঁকে সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠানোর কথা, সেদিনও তিনি একই প্রশ্ন করেন। একজন কর্মকর্তা উত্তর দেন, ‘পাকিস্তানে।’ উত্তর শুনে বিষণ সিং সীমান্ত পার হতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, টোবা টেক সিং ভারতে, আবার কেউ বলে পাকিস্তানে। কিন্তু তিনি নড়েন না। শেষ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মাঝখানের নামহীন একটুকরো জমিতে দাঁড়িয়ে থাকেন।
গল্পের শেষে সূর্য ওঠার আগে বিষণ সিং মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এক পাশে ভারত, অন্য পাশে পাকিস্তান। মাঝখানে নামহীন ভূমিতে পড়ে থাকে টোবা টেক সিং। দেশভাগের ইতিহাসে এর চেয়ে শক্তিশালী প্রতীকী কথাসাহিত্য খুব কমই আছে।
সাত দশক পরও মনে হয়, বিষণ সিং মারা যাননি। তিনি বেঁচে আছেন দক্ষিণ এশিয়ার নানা সীমান্তে। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত আর মানুষের বাস্তবতার মাঝখানে আটকে থাকা মানুষদের মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠেন টোবা টেক সিং।
সম্প্রতি জামালপুরের বকশীগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঠেলে পাঠানো ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মণকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিজিবি তাঁকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। ষষ্ঠী চন্দ্র শেষ পর্যন্ত নিজের দেশে ফিরতে পেরেছেন। কিন্তু সবাই কি পারেন?
গত কয়েক সপ্তাহে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ‘পুশ ইন’ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে পড়েছেন। তাঁরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারছেন না, আবার ভারতেও ফিরতে পারছেন না। কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুটি রাষ্ট্র; মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন কিছু অসহায় মানুষ।
এই মানুষগুলোর মধ্যে নারী আছেন, শিশু আছে, বয়োবৃদ্ধ আছেন। তাঁদের অনেকের অপরাধ শুধু এই যে তাঁরা একসময় সীমান্ত পেরিয়েছিলেন উন্নত জীবনের আশায়, কাজের সন্ধানে কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকার জন্য। রাষ্ট্রের চোখে তাঁরা হয়তো ‘অনুপ্রবেশকারী’; কিন্তু বাস্তবে তাঁরা রক্তমাংসের মানুষ, যাঁদের স্বপ্ন, ভয় ও পরিবার আছে।
একটি শিশু যখন দুই দেশের মাঝখানে শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখন প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি শুধু আইন প্রয়োগ করা, নাকি মানবিকতারও একটি জায়গা আছে? সেই শিশুটি হয়তো আজ বুঝতে পারছে না কী ঘটছে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা তার জীবনে যে ধরনের মানসিক ক্ষত তৈরি করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?
সীমান্তের দুই পাশের মানুষ আত্মীয়তা, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের বন্ধনে যুক্ত ছিলেন হাজার বছরের বেশি। দেশভাগের পর কাঁটাতারের বেড়া উঠেছে, কিন্তু মানুষের সম্পর্ক পুরোপুরি মুছে যায়নি। ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও আত্মীয়তার মতো নানা সামাজিক সূত্র আজও দুই বাংলাকে যুক্ত করে রেখেছে।
মান্টোর বিষণ সিং শেষ পর্যন্ত কোনো দেশের নাগরিক হিসেবে নয়; বরং জাতিগোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক ঘৃণা, অবিশ্বাস ও তার মাধ্যমে সৃষ্ট বিভক্তির প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। আজ সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকালে সেই গল্প আবার মনে পড়ে। তাঁরা হয়তো সাহিত্যের চরিত্র নন, কিন্তু তাঁদের বাস্তবতা টোবা টেক সিংয়ের চেয়ে কম মর্মান্তিক নয়।
তবু বাস্তবতা হলো, যখন সীমান্ত রাজনীতির কেন্দ্রে মানুষ নয়, কেবল পরিচয়পত্র ও আইনি অবস্থান স্থান পায়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে ‘নাগরিক’ থেকে ‘সমস্যা’য় পরিণত হয়। কেউ হয়ে ওঠে ‘বোঝা’, কেউ ‘অনুপ্রবেশকারী’, কেউ ‘নিরাপত্তাঝুঁকি’। কিন্তু খুব কম মানুষই তাদের মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করে।
রাষ্ট্রের অবশ্যই সীমান্ত রক্ষার অধিকার আছে। অবৈধ অভিবাসন, নিরাপত্তা ও আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, কোনো মানুষকে যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া কিংবা শূন্যরেখায় অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা মানবিক প্রশ্ন তৈরি করে।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যদি সত্যিকারের সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব থাকে, তাহলে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। মানুষের ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব যেমন লোকদেখানোর বিষয় নয়, তা প্রমাণসাপেক্ষ; একই কথা খাটে প্রতিবেশীকে হরহামেশাই ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ঘোষণা করলে তা কথায় নয়, প্রয়োজনের সময় কাজে রূপায়ণের মাধ্যমে।
‘পুশ ইন’ নিয়ে সীমান্তে উত্তাপ এবং ভ্রমণ ও বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার প্রশ্নে বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা। আমার তো মনে হচ্ছে না আমি বাংলাদেশে এসেছি। ভারতের ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি, এই ১৬০ কোটি জনগণের জন্য যা ভালো হয়, সেটাই করা হবে। দুই দেশের জন্য ভালো হয়, সেই পদক্ষেপ সামনের দিনে নেব।’
দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠ চষে বেড়িয়ে হাল আমলে কূটনীতিকের দায়িত্ব নেওয়া দিনেশ ত্রিবেদীর এই কথা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, মানুষের কথা ভাবলে তাঁর এই বক্তব্যে দুই দেশের নাগরিকদের জন্য একটি আশার বাণীও আছে। তবে সেই আশার বাস্তব প্রতিফলন হবে তখনই, যখন সীমান্তের মানুষগুলোকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় নয়, মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি বাঁকবদলের সময়ে দিল্লি নিশ্চয় বুঝেশুনেই পেশাদার রাজনীতিবিদ দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় দূত হিসেবে পাঠিয়েছেন। সম্পর্কের মানোন্নয়ন চাইলে প্রতিবেশীর প্রতি বুদ্ধির মারপ্যাঁচের চাইতে হৃদয় দিয়ে ভাবতে হবে। ‘পুশ ইন’ কেবল আইনে সীমাবদ্ধ নয়। শূন্যরেখায় থাকা মানুষগুলোকে স্রেফ সংখ্যা কিংবা রাজনীতির ময়দানে গোল দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দৃষ্টিতে দেখলে রাষ্ট্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। রাষ্ট্র গঠনের প্রধান চারটি উপাদানের অন্যতম জনগণ। সেই জনগণকেই যদি ভুগতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রকাঠামোর সাফল্য নড়বড়ে হয়ে কি না, তা নিয়ে ভাবা দরকার আছে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাঁদের পরিচয়ের কাগজের আগে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখব? নাকি তাঁদেরও একদিন ইতিহাসের আরেকটি সংখ্যা হয়ে যেতে দেব?
সীমান্তের দুই পাশে রাষ্ট্রকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্রের হৃদয় নেই, মমতা নেই, নেই দরদি হওয়ার সুযোগ। সে বোঝে আইন, যুক্তিতর্ক ও কূটনীতির ঘেরাটোপ। কিন্তু রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসকারী নাগরিক ও ক্ষমতাকাঠামোর চূড়ায় অবস্থানকারী কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে মানবিক হওয়ার। আর এই মানবিকতায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ-অনুত্তীর্ণ বিবেচনার একটি মোক্ষম উপায় হলো শূন্যরেখায় আটকে পড়া মানুষদের প্রতি রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষদের আচরণ কেমন হয়, তা।



