২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন জানিয়েছিল, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালের জুনে এসে সেই একই কমিশন—যার প্রধান এখন ভারতের বিশিষ্ট সাবেক বিচারপতি এস মুরলীধর—আবারও জোরালোভাবে বলেছে যে গাজার শিশুদের টার্গেট করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব পুরোপুরি মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে ইসরায়েল।
প্রতিবেদনের ভয়াবহ বিবরণ
৯৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি পড়া সত্যিই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ইসরায়েল গাজায় যে চরম ধ্বংসযজ্ঞ ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালাচ্ছে, তার রোমহর্ষ বিবরণ রয়েছে এতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ২০ হাজার শিশু নিহত এবং আরও ৪৪ হাজার শিশু আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। শিশুদের ওপর এই হামলা কোনো দুর্ঘটনাবশত ঘটনা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল। হতাহত ব্যক্তিদের শতকরা ২৭ ভাগই শিশু। নিহত অনেক ছেলের মাথায় ও ঘাড়ে গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে। গাজার ৯৭ শতাংশ স্কুল ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। শিশু হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ায় গর্ভপাত এবং সন্তান প্রসবজনিত জটিলতা ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।
ইসরায়েলি নেতৃত্বের বর্বরতা
হামাস কর্তৃক ইসরায়েলের ওপর চালানো হামলার পর আড়াই বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাল্টা জবাব ছিল চরম নিষ্ঠুর ও বর্বরতায় ভরা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যরা গাজাকে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ ও ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার ডাক দিয়েছেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন যে তাদের ‘বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই’। এমনকি গাজা থেকে ‘লাখ লাখ মানুষের পালিয়ে যাওয়াকেই’ তাঁরা নিজেদের সাফল্য হিসেবে দেখছেন।
এমন স্পষ্ট গণহত্যামূলক অভিপ্রায় থাকা সত্ত্বেও, ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অকুণ্ঠ সমর্থন ইসরায়েলকে এই নিষ্ঠুর অভিযান চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে। তবে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর বিবেক এবার জেগে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
আমেরিকার ভেটো ও বাধার কারণে জাতিসংঘ কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারলেও, এর সংস্থাগুলো ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের নথিপত্র তৈরিতে চমৎকার ভূমিকা পালন করেছে। পশ্চিমা ব্লকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত শীর্ষ দেশগুলো—যেমন ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া—ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অথচ কয়েক দশক ধরে তারা ফিলিস্তিন ইস্যুতে উদাসীন ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা, যার সঙ্গে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের সংহতির ইতিহাস রয়েছে, তারা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড় করিয়েছে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি সীমিত করেছে এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ সম্পর্ক ছিন্ন বা সীমিত করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এমনকি ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন। ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমন বহু দেশ গাজায় ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ভারতের নীরবতা
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান জনরোষ এবং গাজায় চালানো এই বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের মাঝেও ভারত কেবলই নীরব। বিচারপতি মুরলীধরের এই প্রতিবেদন, যা বিশ্বজুড়ে গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনা ও আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। অবশ্য এটি মোটেও অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। মনে রাখা দরকার, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার আগে বিজেপির নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি মুরলীধর। এর পরপরই তাঁকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে বদলি করা হয়েছিল।
ভারত ঐতিহাসিকভাবে উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংহতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক শান্তির পক্ষে এক অনন্য কণ্ঠস্বর ছিল। কিন্তু আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের লঙ্ঘন, গ্লোবাল সাউথের মানুষের কষ্ট এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবতাবোধের চরম অবমাননার পরও ভারতের এই নীরবতা সত্যিই এক ব্যতিক্রমী ও দুঃখজনক ঘটনা।
হিন্দ রজবের করুণ গল্প
পাঁচ বছরের শিশু হিন্দ রজবের করুণ গল্পটি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার এক নির্মম প্রতীক। গাজা শহর থেকে পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী ৩৩৫টি গুলি চালায়। এতে তার পরিবারের ছয় সদস্যই নিহত হন। উদ্ধারকারীদের আসার অপেক্ষায় হিন্দ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ির ভেতরে স্বজনদের লাশের মাঝে আটকে ছিল। শেষ পর্যন্ত দুই উদ্ধারকর্মীসহ তাকেও হত্যা করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মতো ভারতের নাগরিকদেরও হিন্দ রজব এবং গাজার অসংখ্য শিশুর এই গল্প জানার অধিকার আছে। অথচ, ইসরায়েলের অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে, সে জন্য এই বিষয়ক একটি চলচ্চিত্র ভারতে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। অবশেষে জনগণের তীব্র চাপের মুখে তা প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মোদি সরকারের ভুল কৌশল
মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিকভাবেই ভুল নয়, বরং ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের দিক থেকেও এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ছি, যখন সারা বিশ্ব তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এবং ইরানের ওপর ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যার মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর ইতিহাসে একটি বিভ্রান্তিকর কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে ফিলিস্তিন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঐতিহাসিক বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছি। আমরা বিশ্বজনমত থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। আর এই সুযোগে পাকিস্তানের মতো একটি দেশ, যারা নিজেরা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য পরিচিত, তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে এসেছে—যে ভূমিকার দাবিদার ঐতিহাসিকভাবে সবার বন্ধু হিসেবে ভারতেরই হওয়ার কথা ছিল। নিজেদের নৈতিকতা ও কৌশলগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আমরা কেবল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যকার বন্ধুত্বটুকুই পেয়েছি। অথচ সেই নেতানিয়াহু আজ খোদ আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বেই সমালোচিত।
ভারতের জাতীয়তাবোধের চেতনা দাবি করে যে আমরা যেন আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের পক্ষে কথা বলি, যাঁদের সন্তানদের এভাবে নির্মমভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। দেশের জাতীয় স্বার্থের জন্যও ইসরায়েলি গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড এবং পশ্চিম তীরে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করার বিরুদ্ধে যে বিশ্বজনমত তৈরি হয়েছে, ভারত যেন তার সঙ্গে সুর মেলায়। মোদি সরকারের এই অনড় নীরবতার কোনো যৌক্তিক বা নৈতিক ব্যাখ্যা নেই।



