যুক্তরাষ্ট্র-ইরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ: কে জিতল? সামরিক ও রাজনৈতিক জয়ের দ্বন্দ্ব
নের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার পর এখন বিশ্বজুড়ে একটিই প্রশ্ন এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় হলো কার? জয়-পরাজয়ের এই বিতর্ক এখন কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে মূলধারার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের টেবিলে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েল নিজেদের কৌশলগত বিজয়ের দাবি করছে, অন্যদিকে ইরান বলছে তাদের সক্ষমতা এখনো অক্ষুণ্ন।
ঐতিহাসিক থেকে আধুনিক যুদ্ধ: জয়ের সংজ্ঞার বিবর্তন
ঐতিহাসিক যুদ্ধগুলোতে বিজয় মানেই ছিল ভূখণ্ড দখল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারের ফলে ‘জয়ের’ মানদণ্ড বদলে গেছে। আধুনিক যুদ্ধে সামরিক শক্তির চেয়ে ‘মানুষের হৃদয় জয়’ এবং ‘রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন’ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সমকালীন যুদ্ধগুলো প্রায়ই ‘অপ্রতিসম যুদ্ধের’ রূপ নেয়, যেখানে দুর্বল পক্ষ কেবল টিকে থাকার মাধ্যমেই নিজেদের বিজয়ী দাবি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কৌশলগত সাফল্য
সামরিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঝুলিতে বেশ কিছু কৌশলগত জয় রয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী; ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে। পারমাণবিক স্থাপনার কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু উচ্চপদস্থ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছে।
রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে পশ্চিমা শক্তির ব্যর্থতা
তবে রাজনৈতিকভাবে এই লক্ষ্যগুলো কতটা সফল, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো এবং পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করা। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্দেশ্যগুলোর একটিও পূর্ণাঙ্গভাবে সফল হয়নি। অন্যদিকে ইরান তার রাজনৈতিক কাঠামো ও 'কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল' ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের প্রতিরোধ ও কূটনৈতিক শক্তি
ইরানের প্রধান সাফল্যের জায়গাগুলো হলো:
- হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ: ইরান সফলভাবে যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুকে হরমুজ প্রণালিতে সরিয়ে নিতে পেরেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।
- কূটনৈতিক দরকষাকষি: পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরান ১০ দফার পরিকল্পনা পেশ করে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিয়েছে।
- প্রতিরোধের আদর্শ: প্রবল আক্রমণের মুখেও পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখে তারা প্রমাণ করেছে যে তাদের প্রতিরোধের ক্ষমতা ফুরিয়ে যায়নি।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ও বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা পশ্চিমা বিশ্বের ‘উদার গণতান্ত্রিক’ ইমেজের ক্ষতি করেছে। অপরদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল শোধনাগারে হামলার ফলে ইরানের সঙ্গে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর উত্তেজনা বেড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইরানের আঞ্চলিক কূটনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
চূড়ান্ত ফলাফল: সময়ের অপেক্ষা
সার্বিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একটি কৌশলগত সামরিক জয় পেলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ে তারা বেশ পিছিয়ে। তবে সমকালীন যুদ্ধের জটিল মারপ্যাঁচে এখনই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা কঠিন। প্রকৃত জয় কার হয়েছে, তা নির্ধারণে আরও সময়ের প্রয়োজন। সূত্র: মিডল ইস্ট আই



