যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি বাড়াতে মধ্যস্থতাকারীরা সমঝোতার কাছাকাছি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে এবং আলোচনা পুনরায় শুরু করতে বুধবার মধ্যস্থতাকারীরা সমঝোতার আরও কাছাকাছি পৌঁছেছেন। আগামী সপ্তাহে এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কূটনৈতিক এই তৎপরতার মধ্যেই তেহরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করে, তবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সব বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।
মার্কিন বার্তা সংস্থার প্রতিবেদন
মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সপ্তাহব্যাপী চলা এই চুক্তিতে নৌ-অবরোধ ও নতুন করে হুমকির ফলে অস্থিরতা তৈরি হলেও দুই দেশ যুদ্ধবিরতি বাড়াতে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। এতে নতুন করে কূটনীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব এপি-কে জানিয়েছেন, সংঘাত মেটাতে পাকিস্তান নেতৃত্ব হাল ছাড়ছে না।
ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি
ইরানের জয়েন্ট মিলিটারি কমান্ডের কমান্ডার আলী আবদুল্লাহি বুধবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী যদি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে না নেয়, তবে ইরান পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং লোহিত সাগর দিয়ে সব ধরনের আমদানি-রফতানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আবদুল্লাহি বলেন, ইরান জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং স্বার্থ রক্ষায় সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করবে। এই অবরোধ মূলত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের একটি ভূমিকা মাত্র।
মেয়াদ শেষ ও অমীমাংসিত বিষয়
আগামী ২২ এপ্রিল বর্তমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হবে। তার আগেই মধ্যস্থতাকারীরা তিনটি প্রধান অমীমাংসিত বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করছেন। এগুলো হলো:
- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
- হরমুজ প্রণালি
- যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ
গত সপ্তাহান্তের আলোচনা মূলত এই তিনটি বিষয়ের কারণেই থমকে গিয়েছিল।
সাত সপ্তাহের যুদ্ধে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
সাত সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:
- ইরানে অন্তত ৩ হাজার মানুষ নিহত
- লেবাননে ২ হাজার ১০০ মানুষ নিহত
- ইসরায়েলে ২৩ মানুষ নিহত
- উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে এক ডজনেরও বেশি মানুষ নিহত
- ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত
এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতি ও বাজারে বড় ধরনের সংকটের জন্ম দিয়েছে। বিমান হামলায় ওই অঞ্চলের সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে বুধবার যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত হওয়ার খবরে তেলের দাম কিছুটা কমেছে এবং মার্কিন পুঁজিবাজারে সূচক ঊর্ধ্বগামী হয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য ও চীনের ভূমিকা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স বিজনেস নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি মনে করি তারা (ইরান) খুব গুরুত্বের সঙ্গেই একটি চুক্তি করতে চায়। আমার মনে হচ্ছে যুদ্ধ শেষের খুব কাছাকাছি আমরা।’ বুধবার এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, চীন ইরানকে অস্ত্র না দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, চীন খুব খুশি যে আমি স্থায়ীভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দিচ্ছি। তারা ইরানকে অস্ত্র না পাঠাতে রাজি হয়েছে। উল্লেখ্য, চীন দীর্ঘকাল ধরে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়ে আসলেও ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালির বিষয়টি জড়িত।
নৌ-অবরোধ ও ইসরায়েলের অভিযান
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, নৌ-অবরোধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কোনও জাহাজ তা অতিক্রম করতে পারেনি। ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ মার্কিন বাহিনীর নির্দেশ মেনে পুনরায় ইরানি জলসীমায় ফিরে গেছে। এই অবরোধের মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান মূলত এশিয়ায় লাখ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করে দেশটির অর্থনীতি সচল রেখেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল লেবাননে তাদের বিমান ও স্থল অভিযান অব্যাহত রেখেছে। বুধবার দক্ষিণ লেবাননের বিনত জবেইল এলাকায় হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের ঘিরে রেখে ভারী গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা চালিয়েছে ইরায়েলি বাহিনী। কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম প্রত্যক্ষ আলোচনার পরও এই লড়াই থামেনি। গত মার্চ থেকে চলা এই যুদ্ধে লেবাননে এখন পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।



