যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা: ‘গেম অব চিকেন’ বিশ্ব অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা এখন এক বিপজ্জনক ‘গেম অব চিকেন’ তথা স্নায়ুযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। গত রবিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ার পর এই সংঘাত এক নতুন ও অনিশ্চিত ধাপে প্রবেশ করেছে। এই ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার থেকে ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন, যা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইসলামাবাদ বৈঠকের ব্যর্থতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চললেও মূল বিরোধ বাধে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। বৈঠক শেষে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ইরান সমঝোতায় আগ্রহী না হওয়ায় তিনি আর আলোচনায় সময় নষ্ট করতে রাজি নন। এর পরপরই হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনীকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক খাদের কিনারায় গিয়ে ঠেকেছে।
অর্থনৈতিক ‘গেম অব চিকেন’ ও বিশ্ববাজার
বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে ‘গেম অব চিকেন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন—যেখানে দুই পক্ষ মুখোমুখি সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং যে আগে সরে যাবে তাকেই পরাজয় মেনে নিতে হবে। ৩১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র বাজি ধরছে যে, তারা এই অবরোধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারবে। তবে সিআইএ-র সাবেক বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফট এবং অর্থনীতিবিদ আদনান মাজারির মতে, ইরান কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা সয়ে টিকে থাকার যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তাতে তারা সহজে নতি স্বীকার করবে না। ইতোমধ্যেই এই অবরোধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও জ্বালানির দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এই উচ্চমূল্য বজায় থাকতে পারে। এর ফলে মার্কিন জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ও যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
সামরিক ঝুঁকি ও যুদ্ধের বিস্তৃতি
এই অবরোধ কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং চরম সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইরানের যেকোনো সন্দেহভাজন তেলবাহী জাহাজ আটকাতে এবং প্রয়োজনে ধ্বংস করতে। জবাবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, মার্কিন নৌযানগুলোকে ‘সমুদ্রের তলদেশে’ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সমুদ্রের তলদেশে পেতে রাখা মাইন এবং ইরানের দ্রুতগামী ছোট নৌযান ও ড্রোনগুলো মার্কিন রণতরীগুলোর জন্য এখন বড় হুমকি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই অবরোধ যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। ইরান ইতোমধ্যেই কাতার ও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে। এছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থি মিলিশিয়ারাও এই লড়াইতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা লোহিত সাগরসহ পুরো অঞ্চলের নৌ-চলাচলকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতির সামরিক সমাধানের পরিবর্তে কূটনৈতিক পথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, কোনো পক্ষই পিছু হঠতে রাজি নয়। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক কারেন ইয়াং মনে করেন, মার্কিন নৌবাহিনী যতটা সময় এই অবরোধ পাহারা দিতে পারবে, ইরান সম্ভবত তার চেয়েও বেশি সময় টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে। এখন দেখার বিষয়, এই বিপজ্জনক খেলায় শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ আগে নতি স্বীকার করে এবং বিশ্ব অর্থনীতি এই ধাক্কা কতটা সামলে নিতে পারে।



