নেতানিয়াহুর 'বৃহত্তর ইসরায়েল' পরিকল্পনা: যুদ্ধবিরতির আড়ালে আধিপত্যের লড়াই
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে দুই সপ্তাহের বিরতি ঘোষণা করা হলেও এই বিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো ব্যাপক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। তবে ছয় সপ্তাহ আগে যেমনটা স্পষ্ট ছিল, আজও সেই বিষয়টি সমানভাবে পরিষ্কার। সেটি হলো, এই যুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো সুস্পষ্ট বা সুসংহত পরিকল্পনা নেই, কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে।
ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য
ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইরান রাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চভাবে দুর্বল করে দেওয়া। তাদের লক্ষ্য সরাসরি সরকার পরিবর্তন করা নয়, বরং ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই ভেঙে ফেলা। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও নেতানিয়াহু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এটি 'অভিযানের শেষ নয়' এবং যেকোনো সময় আবার যুদ্ধ শুরু করার জন্য ইসরায়েল সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কৌশলবিদ হিসেবে নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের এই অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য—'বৃহত্তর ইসরায়েল' বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই পরিকল্পনা কেবল ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ধারণা নয়, বরং একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রকল্প।
ভূখণ্ড দখল ও আঞ্চলিক সম্প্রসারণ
ইসরায়েলের ডানপন্থী মহলের কাছে 'বৃহত্তর ইসরায়েল' প্রায়শই কেবল ভূখণ্ড বাড়ানোর ধারণা হিসেবে দেখা হয়। গত আড়াই বছরে গাজা উপত্যকাকে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ইসরায়েল আবারও সেটি দখল নিয়েছে। এই অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছে এবং গাজার বেসামরিক অবকাঠামো প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
এক হিসাবে, গত বছর গাজার জনগণকে তাদের পূর্বের ছোট্ট ভূখণ্ডের মাত্র ১২ শতাংশ জায়গার মধ্যে গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ধ্বংস ও উচ্ছেদ অভিযান ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মাত্রায় চলছে। সেখানে ইসরায়েল তার নিয়ন্ত্রণ ও বসতি স্থাপনের পরিধি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।
২০২৪ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর ইসরায়েল সিরিয়ার ভেতরে নতুন অঞ্চল দখল করেছে, যার মধ্যে অবৈধভাবে দখলকৃত গোলান মালভূমিও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া দক্ষিণ লেবাননে আবার দখলদারির অঞ্চল তৈরি করছে তারা। তবে 'বৃহত্তর ইসরায়েল' শুধু ভূখণ্ড বাড়ানোর ধারণা নয়; এটি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনাও বটে। জমি দখল করা তুলনামূলকভাবে সহজ অংশ; আসল লক্ষ্য আরও বড় ও জটিল।
নতুন জোট গঠন ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা
নেতানিয়াহু তাঁর বৃহত্তর পরিকল্পনার কিছু অংশ প্রকাশ্যেও ব্যক্ত করেছেন। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে বা তার ভেতরে একটি 'ষড়্ভুজ জোট' তৈরি করতে চান। এই জোটে থাকবে:
- ভারত
- আরব দেশগুলো
- আফ্রিকার দেশগুলো
- ভূমধ্যসাগরীয় দেশ (যেমন গ্রিস ও সাইপ্রাস)
- এশিয়ার অন্যান্য দেশ
এই জোটের কেন্দ্রবিন্দু হবে ইসরায়েল। এই পরিকল্পনা বুঝতে হলে কয়েক বছর পেছনে যেতে হয়। ৭ অক্টোবর ইসরায়েলিদের ওপর ভয়াবহ হামলার পর এবং গাজায় ইসরায়েলের কঠোর প্রতিক্রিয়ার ফলে আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা থমকে যায়।
তখন নেতানিয়াহুর সামনে দুটি পথ ছিল—ফিলিস্তিনিদের প্রতি কিছুটা সহনশীল হয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা অথবা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে কঠোর অবস্থানে থাকা। তিনি দ্বিতীয় পথই বেছে নেন। এর জন্য ইরানে হামলা করে তাকে দুর্বল করে দেওয়া প্রয়োজন ছিল, কারণ ইরানকে এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে দেখা হয়। আর সেই হামলা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ও বড় ধরনের সামরিক সহায়তায়ই সম্ভব ছিল।
সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার একটি সাম্প্রতিক লেখায় বলা হয়েছে, ইসরায়েল শুধু সরাসরি ভূখণ্ড দখলই করবে না, বরং সীমান্তের বাইরে থেকেও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। তাদের মতে, ইসরায়েল হবে পুরো অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি, যা একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং সেখানে ইসরায়েলের স্বার্থই প্রধান হবে।
সাম্প্রতিক বক্তৃতায় নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে শুধু 'আঞ্চলিক পরাশক্তি' নয়, কিছু ক্ষেত্রে 'বৈশ্বিক পরাশক্তি' বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি এমন একটি জোট গড়তে চান, যা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি কমে গেলেও টিকে থাকবে। এই জোটকে তিনি ব্যবহার করতে চান তথাকথিত 'চরমপন্থী শিয়া অক্ষ' এবং 'উদীয়মান চরমপন্থী সুন্নি অক্ষ'-এর বিরুদ্ধে। এমনকি ইসরায়েল পরবর্তী 'হুমকি' হিসেবে তুরস্কের নামও উল্লেখ করেছে।
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই 'বৃহত্তর ইসরায়েল' আধিপত্যের প্রকল্পকে ঠেকানো ও সীমার মধ্যে রাখাই যুদ্ধ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। নেতানিয়াহুর কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত নীতির মধ্যে এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ইসরায়েলের আধিপত্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা আগামী দিনগুলোর জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।



