ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনা: ২০ বছর বনাম ৫ বছরের প্রস্তাবে অচলাবস্থা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পারমাণবিক আলোচনা একটি কঠিন ও সংকটপূর্ণ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম কতদিনের জন্য স্থগিত রাখা হবে এই প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, ইরানকে কমপক্ষে ২০ বছরের জন্য তার সমস্ত পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে, যদিও এটি একটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়। এই শর্তের মাধ্যমে ইরান তার পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের আন্তর্জাতিক অধিকার ত্যাগ করছে না বলেও দাবি করতে পারবে।
ইরানের পাল্টা প্রস্তাব ও আলোচনার ইতিহাস
কিন্তু ইরান যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাব মেনে নেয়নি। দুইজন ইরানি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, তেহরান সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য তার পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখতে প্রস্তুত। উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি মাসে জেনেভায় অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় ইরান একই প্রস্তাব দিয়েছিল, যা ব্যর্থ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার নির্দেশ দেন।
সম্প্রতি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টাব্যাপী এক দীর্ঘ আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনা শেষে ভ্যান্স মন্তব্য করেন, ‘ইরানের সঙ্গে কিছু ইতিবাচক কথা হয়েছে, কিন্তু এখন দেখার বিষয় হলো তেহরান কতটুকু নমনীয়তা দেখাতে পারে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরান কিছুটা নমনীয় হয়েছে, তবে ‘প্রয়োজনীয় মাত্রায় এগোয়নি।’ পরবর্তী আলোচনা হবে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেন, ‘এই উত্তর ইরানকেই দেওয়া উচিত।’
হোয়াইট হাউসের অবস্থান ও অর্থনৈতিক ইস্যু
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এবং আলোচনা দল যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের কার্যকর নৌ অবরোধের কারণে ইরানের মরিয়া ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ তাদের তেলের জাহাজগুলো এখন সুন্দর গালফ অব আমেরিকার দিকে যাত্রা করছে।’
এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের কাছে থাকা প্রায় ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। যুক্তরাষ্ট্র চায় এই জ্বালানি ইরানের সীমানার বাইরে পাঠানো হোক, কিন্তু ইরান দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে যে জ্বালানি দেশের বাইরে যাবে না। তবে তারা এটি এতটাই পাতলা করে দিতে রাজি, যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা না যায়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই আলোচনা জটিলতা তৈরি করেছে। ইরান দাবি করছে যে কাতারে আটকে থাকা প্রায় ৬০০ কোটি ডলার মুক্তি দেওয়া হোক, যা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকা পড়েছে। এই অর্থনৈতিক চাপ পারমাণবিক আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলছে, যেখানে উভয় পক্ষই তাদের অবস্থান থেকে সরে আসতে অনিচ্ছুক।
সামগ্রিকভাবে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা একটি অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে সময়সীমা, ইউরেনিয়াম নিষ্পত্তি এবং অর্থনৈতিক শর্তগুলো সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যত আলোচনা কতটুকু সফল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।



