প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উপর একটি কঠোর সময়সীমা আরোপ করেছেন, যা মঙ্গলবার রাত আটটার মধ্যে শেষ হয়েছে। তিনি ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বা একটি চুক্তিতে আসার জন্য চাপ দিয়েছেন, অন্যথায় ইরানের অবকাঠামোতে বিধ্বংসী হামলার হুমকি দিয়েছেন। তবে তেহরান থেকে এখনো কোনো নমনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, যা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে, সময়সীমা পেরিয়ে গেলে ইরান সাধারণ প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেবে না, বরং তাদের কৌশল হবে ‘লেয়ার্ড এসিমেট্রি’ বা যুদ্ধের মূল্য এতটাই বাড়িয়ে দেওয়া যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতি নিজেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে ইরান পাঁচটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ নিতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী সংকট তৈরি করতে সক্ষম।
১. বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো তার ভৌগোলিক অবস্থান। হরমুজ প্রণালিতে স্মার্ট মাইন ও জিপিএস জ্যামিং ব্যবহার করে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটিকে ‘কিল জোন’ হিসেবে গড়ে তুলেছে। এর ফলে ইতোমধ্যে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এখানে একটি মাত্র ট্যাংকার ডুবলেও তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এছাড়াও, পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের তলদেশে অবস্থিত ফাইবার অপটিক ক্যাবলগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এই ক্যাবলগুলো কেটে দেওয়া হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ, ব্যাংকিং লেনদেন এবং তথ্য আদান-প্রদান সম্পূর্ণভাবে বিঘ্নিত হবে, যা ‘ডিজিটাল আরমাগেডন’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
২. তেলের আঞ্চলিক অবকাঠামো ধ্বংস
ইরানের একটি সুস্পষ্ট নীতি হলো, ‘আমরা তেল বিক্রি করতে না পারলে অন্য কেউ পারবে না।’ সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কাতারের পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ লক্ষ্য হতে পারে। এই কেন্দ্রগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হলে বড় উপসাগরীয় শহরগুলোতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র পানি সংকট দেখা দিতে পারে, যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলবে।
৩. সাইবার যুদ্ধের সম্ভাবনা
ইরানের ‘হান্দালা’ গ্রুপের মতো সাইবার দলগুলো ইতোমধ্যে সক্রিয় রয়েছে। এই দলগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলোতে হামলা চালাতে সক্ষম। এছাড়াও, তারা জাহাজের জিপিএস সংকেত পরিবর্তন করে সামুদ্রিক সংঘর্ষ ঘটানোর ক্ষমতা রাখে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
৪. ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’-এর ব্যবহার
ইরান তার আঞ্চলিক মিত্রদেরও এই সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। ইরাক ও সিরিয়া থেকে মার্কিন ঘাঁটিতে রকেট ও ড্রোন হামলা, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগর বন্ধ করা এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মাধ্যমে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে হামলা একসাথে সংঘটিত হতে পারে। এই সমন্বিত আক্রমণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ভেঙে দিতে পারে।
৫. যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সাম্রাজ্যে ফাটল
ইরান চীন, রাশিয়া এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর জাহাজগুলোকে ‘সেফ প্যাসেজ’ প্রদান করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক জোটে ফাটল ধরাতে সক্ষম। এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অন্যান্য দেশগুলোকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, ফলে বৈশ্বিক কূটনৈতিক ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের মূল লক্ষ্য
ইরানের প্রাথমিক উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সামরিকভাবে পরাজিত করা নয়, বরং মার্কিন বিজয়কে এতটাই ব্যয়বহুল করে তোলা যাতে সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই ডেডলাইন পেরিয়ে গেলে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।



