ইরান-মার্কিন আলোচনায় অচলাবস্থা: সমঝোতা ব্যর্থ, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসলামাবাদ ত্যাগ
দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে কোনও সমঝোতা ছাড়াই পাকিস্তানের ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া চূড়ান্ত প্রস্তাব তেহরান প্রত্যাখ্যান করায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই ব্যর্থতা ট্রাম্প প্রশাসনকে এখন এক কঠিন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। হয় তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দর-কষাকষিতে যেতে হবে, অথবা পুনরায় সেই যুদ্ধে ফিরতে হবে, যা ইতোমধ্যে আধুনিক সময়ের সবচেয়ে বড় জ্বালানি বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও পরবর্তী পদক্ষেপ
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বর্তমানে সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে ফ্লোরিডায় রয়েছেন। তবে যুদ্ধ কিংবা দীর্ঘ আলোচনার পথ, উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি। ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টাকারী যেকোনও জাহাজ অবরোধ করা শুরু করবে মার্কিন নৌবাহিনী।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানিয়েছেন, তিনি নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আন্তর্জাতিক জলসীমায় এমন প্রতিটি জাহাজকে খুঁজে বের করা হয় এবং বাধা দেওয়া হয়, যারা ইরানকে মাশুল দিয়েছে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, যারা ইরানকে অবৈধভাবে টোল দেবে, গভীর সমুদ্রে তাদের নিরাপদ চলাচলের কোনও নিশ্চয়তা থাকবে না। এর আগে জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আমরা আমাদের চূড়ান্ত সীমার কথা স্পষ্ট করে দিয়েছি। কিন্তু তারা আমাদের শর্তগুলো গ্রহণ না করার পথ বেছে নিয়েছে।
ইরানের অনড় অবস্থান ও যুদ্ধের প্রভাব
পেন্টাগনের তথ্যমতে, গত ৩৮ দিনের যুদ্ধে ইরানের ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ধারণা ছিল, মার্কিন সামরিক শক্তির এমন ভয়াবহ প্রদর্শনী ইরানকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবে। কিন্তু ইরান উল্টো অনড় অবস্থান নিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আমাদের মহান নেতাদের হারানো এবং দেশবাসীর রক্ত আমাদের অধিকার আদায়ের লড়াইকে আরও দৃঢ় করেছে।
ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মতে, ইরানকে একেবারে আত্মসমর্পণ করতে হবে। তবে ওবামা আমলের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এত দীর্ঘ সময় দিতে নারাজ। ফেব্রুয়ারিতে জেনেভা আলোচনা যে কারণে থমকে গিয়েছিল, ইসলামাবাদেও সেই একই জটিলতা দেখা দিয়েছে। ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে রাজি হলেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ত্যাগে রাজি নয়। ইরানের দাবি, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি চুক্তির সদস্য হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা তাদের অধিকার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, এই সুযোগ থাকা মানেই যেকোনও সময় ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অটুট থাকা।
জ্বালানি সংকট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আগামী ২১ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ আরও কমবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি (যা ইতোমধ্যে ৩.৩ শতাংশে পৌঁছেছে) নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতেই মূলত গত সপ্তাহে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন। ইরানের কাছে এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। তেহরান তাদের শর্তের তালিকায় সবার উপরে রেখেছে এই জলপথের বিষয়টি। এছাড়া তারা যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং গত দুই দশকের সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিপূরণের দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি ইরানের শর্ত পালনের ওপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছে।
ইসলামাবাদ সফর শেষে এটিই স্পষ্ট হয়েছে যে, দুই পক্ষই নিজেদের জয়ী মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্র ভাবছে তারা ইরানকে ধ্বংস করেছে, আর ইরান ভাবছে তারা টিকে গেছে। এই পরিস্থিতিতে কোনও পক্ষই আপস করার মনোভাবে নেই, যা মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিশ্চিত সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।



