মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা: ইসলামাবাদে ইরান-মার্কিন বৈঠকের প্রস্তুতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের চূড়ান্ত সমাধান খুঁজতে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাতেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছে গেছে ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদাম সরাসরি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে আগামী ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে চলা এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। কয়েক দশকের চরম উত্তেজনা ও সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এই আলোচনাকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার শেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা।
ইরানের ১০ দফা দাবি ও হরমুজ প্রণালী বিতর্ক
ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা মোগাদাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত একটি পোস্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে ইসরায়েলি বাহিনী বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় তেহরানের জনমানসে গভীর সংশয় ও তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে তিনি এ-ও যোগ করেছেন যে বৃহত্তর শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে ইরান তাদের প্রস্তাবিত ‘১০ দফা দাবির’ ভিত্তিতেই এই আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে।
এই আলোচনার সফলতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। ইরান ইতিপূর্বে একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই জলপথ অতিক্রমের চেষ্টা করলে তা ধ্বংস করে দেওয়া হবে। বর্তমানে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকার প্রতিবাদে ইরান পুনরায় এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথটি বন্ধ করে দেওয়ায় উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতি ও মার্কিন অবস্থান
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট একটি ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন যে বর্তমানে জারি থাকা সাময়িক যুদ্ধবিরতি এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি স্থাপনের একটি অনন্য পথ খুলে দিয়েছে। লেভিটের দাবি অনুযায়ী, প্রকাশ্যে ইরান কঠোর অবস্থান দেখালেও একান্ত আলোচনা ও গোপন বৈঠকে তাদের সুর যথেষ্ট নরম ও সমঝোতামূলক।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র মাধ্যমে ইরানের নৌবাহিনী, ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, যা আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। এই আলোচনার টেবিলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাশাপাশি বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারও সশরীরে উপস্থিত থাকবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আলোচ্যসূচি নিয়ে মতপার্থক্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আলোচনার আলোচ্যসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান তাদের ১০ দফা দাবির ওপর অনড় থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবগুলো নাকচ করে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি ও চাপের মুখে তেহরান তাদের প্রাথমিক অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।
তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল স্বাভাবিক রাখা এই শান্তি চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হওয়ায় দুই পক্ষই এই বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। ইসলামাবাদের এই বৈঠকের ফলাফল ও অগ্রগতির ওপরই সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে নাকি নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হবে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন যে এই আলোচনা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদে হওয়া এই বৈঠকের প্রতিটি ধাপ সারা বিশ্বের নজর রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



