ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির ৪০ বছরের যাত্রা: যেভাবে বিশ্বকে চমকে দিলো
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি ব্যবহার করছে ড্রোন, যা তাদের সামরিক সক্ষমতাকে বিশ্ব দরবারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তবে এই সক্ষমতা এক দিনে অর্জিত হয়নি; প্রায় ৪০ বছরের নিরলস প্রচেষ্টা, গবেষণা ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ফসল এটি। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামিক বিপ্লবের পর ইরানের নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু ১৯৮০ সালে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি বদলে যায়।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও ড্রোনের সূচনা
ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় ইরানের হাতে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা অস্ত্র, কারণ শাহ পাহলোভি সরকারের আমলে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। যুদ্ধের প্রথম দিকে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, ইরাকের উন্নত রাডার প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ইরানের বিমানবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এই সংকটে ইরান বুঝতে পারে যে তাদের এমন একটি অস্ত্র দরকার, যা যুদ্ধবিমানের মতো কার্যকর কিন্তু মানুষবিহীন, কম খরচে তৈরি করা যায় এবং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
এই চিন্তা থেকেই ড্রোন প্রযুক্তির পেছনে বিনিয়োগ শুরু করে ইরান। ১৯৮৪ সালে ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম পাইলটবিহীন বিমান তৈরির পরীক্ষা শুরু করে, যা ইরানের ড্রোন যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে চিহ্নিত। একই সময় ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে, যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে অগ্রগতি ধীর ছিল।
প্রযুক্তির উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ
১৯৮৫ সালে ইরান মোহাজির-১ ড্রোন তৈরি করে, যা ইরাকের সেনাদের ওপর নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হয়। এরপর আবাবিল ড্রোনের আবির্ভাব ঘটে, যা হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখত। প্রথম দিকের আবাবিল মাত্র কয়েক মাইল দূরত্বে হামলা চালাতে পারলেও, মানোন্নয়নের মাধ্যমে এটি একটি শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আবাবিল-৩ ড্রোন এখন আট ঘণ্টা উড়তে সক্ষম।
যাইহোক, ইরানের ড্রোন কর্মসূচি নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়। ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা ইরানের অস্ত্র আমদানিকে ব্যাহত করে। ১৯৮৮ সালে অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিস অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়, ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এই সংকটে ইরান দেশীয়ভাবে অস্ত্র উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং ড্রোন তৈরিতে বেসামরিক ব্যক্তিদের, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে, যা প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও প্রযুক্তির বিস্তার
ইরানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পেছনে ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। নাসির আল-দিন শাহের আমলে ইরান আধুনিকীকরণের পথে এগোয়, এবং মোহাম্মদ রেজা শাহর সময় ১৯৫৭ সালে পরমাণু কর্মসূচি শুরু হয়। নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান তুরস্ক ও আরব আমিরাতের কালোবাজার থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে, এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানি থেকে ইঞ্জিন আমদানি করে সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিজস্ব ড্রোনে ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ, শাহেদ ১৩৬ ড্রোনে জার্মানির ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়, যা ইরানের ড্রোন প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
বর্তমানে ইরানের ড্রোন ভান্ডারে মোহাজির ও আবাবিল ছাড়াও ফোতরোস, হামায়েস, কামান, কারার, মেরাজ, সারির, নাজির, রাদ, সিরাফ, মাহি, ইয়সিরসহ অন্তত ১৩ ধরনের ড্রোন রয়েছে। শাহেদ সিরিজের মতো ড্রোনগুলোর একাধিক মডেল, যেমন শাহেদ-১০১ থেকে শাহেদ-২৩৮, ইরানের সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
৪০ বছরের এই যাত্রায় ইরান প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে কীভাবে একটি দেশ প্রযুক্তিগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। আজ ইরানের ড্রোনগুলি নজরদারি থেকে শুরু করে সুইসাইড হামলা পর্যন্ত বিস্তৃত কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।



