ইরানে মার্কিন ক্রু উদ্ধার: ট্রাম্পের ‘দুঃসাহসিক অভিযান’ ও উত্তেজনার নতুন মাত্রা
ইরানে ভূপাতিত হওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমানের দ্বিতীয় ক্রুকে সফলভাবে উদ্ধার করা হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত রোববার তিনি এই মরিয়া অভিযানকে মার্কিন ইতিহাসের ‘সবচেয়ে দুঃসাহসিক অভিযান’ বলে আখ্যায়িত করেন। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্ধার অভিযানে কয়েক ডজন সামরিক উড়োজাহাজ ও কয়েক শ কমান্ডো অংশ নিয়েছিলেন, যা ইরানের পাহাড়ি এলাকা থেকে সাত ঘণ্টার অপারেশনে সম্পন্ন হয়েছে।
ইরানের দাবি: মার্কিন অভিযান ব্যর্থ, উড়োজাহাজ ধ্বংস
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবির বিপরীতে ইরান অভিযানটি ‘ব্যর্থ হয়েছে’ বলে জানিয়েছে। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি দাবি করেছেন, উদ্ধার অভিযানের সময় মার্কিন দুটি সি-১৩০ সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ ও দুটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, চাকা আটকে যাওয়া উড়োজাহাজ দুটি মার্কিন সেনারা নিজেরাই ধ্বংস করে দিয়েছেন যেন তা শত্রুদের হাতে না পড়ে।
ট্রাম্পের হুমকি: হরমুজ প্রণালি খুলতে চূড়ান্ত সময়সীমা
এদিকে, যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে চাপ প্রয়োগ করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সময় মঙ্গলবার রাত আটটা (ইস্টার্ন টাইম) চূড়ান্ত সময়। এর মধ্যে ইরান যদি চুক্তিতে রাজি হয়ে হরমুজ প্রণালি না খুলে, তবে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের এই হুমকিকে ইরান ‘যুদ্ধাপরাধের উসকানি’ বলে মন্তব্য করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসের হুমকি গোটা জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকিতে ফেলার শামিল, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য।
অব্যাহত হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
উত্তেজনার মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে। ইসরায়েলের হাইফায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি ভবন ধসে পড়েছে, যাতে আহত হয়েছেন ২৪ জন। ইরান দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন কোম্পানিগুলোর পেট্রোকেমিক্যাল, তেল ও গ্যাসের স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
এছাড়া, ইসরায়েল ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াইও চলমান, যেখানে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের এক সেনা নিহত হয়েছেন। ইরানের আর্মি এয়ার ডিফেন্স কলেজের একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলও মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
মধ্যস্থতা ও আলোচনার প্রচেষ্টা
উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতাকারীরা উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ প্রয়োগের ভাষা পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ওমানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নেতৃত্বে একটি বৈঠকেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যদিও ইরান সরাসরি আলোচনার কথা বারবার নাকচ করে আসছে।
এই সংকটে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের কিছু কর্মকর্তা আলোচনা করছেন এবং সোমবারের মধ্যে চুক্তির ‘ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মতি না আসায় পরিস্থিতি অনিশ্চিত রয়ে গেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।



