ইরানের সামরিক শক্তির অদৃশ্য স্তম্ভ: বিশেষ বাহিনীর সমন্বিত কাঠামো
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা প্রায়শই কুদস ফোর্সকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। তবে, দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে এই বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, স্বল্পমেয়াদী সংঘাত বা তাৎক্ষণিক অভিযানের ক্ষেত্রে ইরানের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে অন্য কিছু বিশেষ বাহিনীর ওপর। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দ্বীপ, বন্দর বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হঠাৎ অভিযান বা সীমিত যুদ্ধের প্রয়োজন পড়লে কুদস ফোর্স নয়, বরং ইরানের একটি বিকেন্দ্রীকৃত বিশেষ বাহিনী সবার আগে সাড়া দেয়।
সাবেরিন: আইআরজিসির স্থল বাহিনীর মূল শক্তি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) স্থল বাহিনীর মূল শক্তি হলো ‘সাবেরিন’। এটি কেবল একটি একক ইউনিট নয়, বরং একটি বিশেষ সক্ষমতার নাম যা ইরানের বিভিন্ন আঞ্চলিক ইউনিটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্গম ভূখণ্ডে অভিযান, হেলিকপ্টার থেকে অবতরণ এবং অতর্কিত হামলা চালানোয় এরা পারদর্শী। পশ্চিমা বিশেষ বাহিনীর মতো এরা অপারেশন শেষে ফিরে যায় না, বরং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সেখানেই অবস্থান করে, যা তাদের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বাড়িয়ে তোলে।
নোহেদ: নিয়মিত সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনী
আইআরজিসির বাইরে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী বা ‘আর্তেশ’-এরও নিজস্ব বিশেষ বাহিনী রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ৬৫তম এয়ারবর্ন স্পেশাল ফোর্সেস ব্রিগেড, যা ‘নোহেদ’ নামে পরিচিত। তারা মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সরাসরি অ্যাকশনে অভিজ্ঞ। ২০১৬ সালে সিরিয়ায় এদের মোতায়েন প্রমাণ করেছিল যে, প্রয়োজন পড়লে ইরান তার প্রথাগত বাহিনীকেও বিদেশের মাটিতে ব্যবহার করতে সক্ষম, যা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করে।
এসএনএসএফ: পারস্য উপসাগরে নৌবাহিনীর বিশেষ শাখা
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বজায় রাখে আইআরজিসি নৌবাহিনীর বিশেষ শাখা ‘এসএনএসএফ’। সমুদ্রবক্ষে জাহাজ জব্দ করা বা কৌশলগত জলসীমায় বাধা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই ডুবুরি ও উভচর বাহিনীই প্রধান ভূমিকা পালন করে। পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন দ্বীপে এদের স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে, যা অঞ্চলটিতে ইরানের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে।
বাসিজ: অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সহায়তা
নিবন্ধে আরও উঠে এসেছে ‘বাসিজ’ বাহিনীর কথা। যদিও এদের অভ্যন্তরীণ দমনে ব্যবহার করা হয় বলে ধারণা আছে, তবে এর ‘ফাতেহিন’ ইউনিটের মতো কিছু অংশ উচ্চতর প্রশিক্ষিত এবং সিরিয়ার যুদ্ধেও এদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেছে। বড় কোনো সংকটে এরা স্থানীয় তথ্য সরবরাহ ও বাড়তি জনবল দিয়ে মূল বাহিনীকে সহায়তা করে, যা সামগ্রিক সামরিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে তোলে।
সমন্বিত ব্যবস্থা: স্তরে স্তরে কার্যক্রম
ইরানের এই বিশেষ বাহিনীগুলো পশ্চিমা ‘সিল টিম সিক্স’ বা ‘ডেল্টা ফোর্সের’ মতো একক কোনো ব্রান্ড নয়। বরং এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা যা আক্রমণ প্রতিহত করতে স্তরে স্তরে কাজ করে। প্রথমে স্থানীয় বাসিজ ও আইআরজিসি ইউনিট পরিস্থিতি সামাল দেয়, এরপর সাবেরিন বা নোহেদ-এর মতো উচ্চতর প্রশিক্ষিত বাহিনীগুলো এসে পাল্টা আঘাত হানে। দৃশ্যত এই বাহিনীগুলো আলোচনায় কম থাকলেও, তাদের এই জটিল ও ছড়িয়ে থাকা সাংগঠনিক কাঠামোর কারণেই এদের কার্যক্রম ব্যাহত করা অত্যন্ত কঠিন, যা ইরানের সামরিক কৌশলকে অনন্য করে তোলে।



