ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ইরানের অবস্থান ও শান্তির সম্ভাবনা
ইরানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইরান জয়লাভ করছে। যদিও যুদ্ধের সূচনা ইরান করেনি, তবুও এক মাসের বেশি সময় পর ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান সফলভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম বোমা হামলা সত্ত্বেও ইরান নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং প্রতিরোধের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ইরানের প্রতিরোধ ও সাফল্যের কারণ
কিছু ইরানির মতে, আলোচনার বদলে হামলাকারীদের যথোপযুক্ত শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এই সাফল্যের বড় কারণ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতি রাতে দেশজুড়ে অগণিত ইরানি জড়ো হয়ে ‘কোনো আত্মসমর্পণ নয়, কোনো আপস নয়, আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়ো’ স্লোগান দিচ্ছেন। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা গুপ্তহত্যার শিকার হওয়ার পরও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন এবং হামলাকারীদের ওপর পাল্টা আঘাত হেনেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রান্ত ধারণা ও চোরাবালি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে এখন চোরাবালিতে আটকে গেছে। তাদের বের হওয়ার কোনো কৌশল নেই। অন্যদিকে, ইরানিরা প্রতিরোধের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে ইরানিরা মনে করেন, তাই আপসের সুযোগ দেওয়ার কোনো কারণ নেই।
যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ও ঝুঁকি
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মনস্তাত্ত্বিকভাবে তৃদ্ধিদায়ক মনে হলেও এটি বেসামরিক মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর আরও ধ্বংস ডেকে আনবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ, জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে এবং সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এই সংঘাত ধীরে ধীরে আরও অনেক দেশকে টেনে আনছে, যা আঞ্চলিক সংঘাতকে বৈশ্বিক সংঘাতে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
শান্তির পথে এগোনোর প্রয়োজনীয়তা
তেহরানের উচিত তাদের সুবিধাজনক অবস্থানকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কাজে না লাগিয়ে, বরং বিজয় ঘোষণা করে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো। সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আনা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচিত পারস্পরিক অনাক্রমণ চুক্তি গ্রহণ করা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
মার্কিন নীতির বিভ্রান্তি ও ইরানের ক্ষোভ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বিবৃতি দিচ্ছেন। তিনি একদিকে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে সামরিক অভিযান শেষ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, কারণ নতুন শতাব্দীর শুরু থেকে তারা বারবার মার্কিন প্রতারণার শিকার হয়েছে। ২০০১ সালের পর আফগানিস্তানে সহায়তা দেওয়া সত্ত্বেও ইরানকে শত্রু তালিকায় রাখা হয়েছে।
শান্তিচুক্তির সম্ভাব্য রূপরেখা
একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ প্রয়োজন:
- পারস্পরিক আদান-প্রদানের মানসিকতা গ্রহণ করা।
- হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
- যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের তেল বিক্রি ও আয় প্রত্যাবাসনের অনুমতি দেওয়া।
- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।
- একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গঠন করা।
- পারস্পরিক লাভজনক বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা শুরু করা।
- যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি পুনর্গঠনে অর্থায়ন করা।
চ্যালেঞ্জ ও আশার কথা
এই চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ নয়, কারণ ইরানিরা ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান এবং ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানকে সন্দেহের চোখে দেখে। তবে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো নিশ্চয়তা দিতে পারে। এই যুদ্ধ ভয়াবহ হলেও এটি একটি টেকসই মীমাংসার দরজা উন্মুক্ত করেছে। ইরানিরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, এবং মার্কিন কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছেন যে ইরান সরকার কোথাও যাচ্ছে না। শান্তি স্থাপনকারীদের ইতিহাস সবচেয়ে ভালোভাবে মনে রাখে।



