যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী গণবিক্ষোভ ও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট
ইরানের বিরুদ্ধে অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করার এক মাস পূর্তির দিনে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অনুষ্ঠিত হলো এক নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ। ২৮ মার্চ দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রায় সব শহরে ৮৫ লাখের বেশি মানুষ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে। 'নো কিংস মার্চ' কর্মসূচির আওতায় ৩ হাজারের বেশি নাগরিকের বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ট্রাম্পকে 'অযোগ্য', 'শিশুধর্ষক' এবং 'মানসিক বিকারগ্রস্ত' আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তার পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে মিনিয়াপোলিস, শিকাগো থেকে সান ফ্রান্সিসকো পর্যন্ত সব বড় শহরই প্রকম্পিত হয়েছে ট্রাম্পবিরোধী স্লোগানে।
ইরান যুদ্ধের দ্বিতীয় মাস ও রেজিম পরিবর্তনের সম্ভাবনা
এদিকে, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করেছে, যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তিন/চার দিনের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করার পর ট্রাম্প তার 'ট্রুথ সোশ্যাল চ্যানেলে' ইরানি জনগণকে 'উঠে দাঁড়ানোর' আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, 'আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। আমরা শেষ করলে আপনারা সরকার দখল করুন।' এই ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে, তার ইরান আক্রমণের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল রেজিম চেঞ্জ।
তবে, ইরান যুদ্ধকে পঞ্চম সপ্তাহে টেনে নিয়ে এসেছে এবং রেজিম চেঞ্জের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে ইরানের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নেতা আমেরিকা বা ইসরাইলের আক্রমণে নিহত হয়েছেন, কিন্তু ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে নাকানিচুবানি খাইয়ে চলেছে। ট্রাম্পের অসংলগ্ন বক্তব্য, যেমন কখনো তিনি নিজেকে ইরানের সুপ্রিম নেতা দাবি করছেন, কখনো যুদ্ধ শেষ বলে ঘোষণা দিচ্ছেন, বাস্তবতাকে অস্পষ্ট করে তুলেছে।
যুদ্ধের প্রভাব ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরান এই অপ্রতিসম যুদ্ধটাকে আনুভূমিকভাবে গোটা পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে তার নিয়ন্ত্রণ আরো সংহত করেছে। এছাড়া, 'বাব এল মান্দেব' প্রণালি নিয়েও নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যেখানে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের অবস্থান। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান যদি হুতিদের যুদ্ধে নামায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন এই যুদ্ধকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন। জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভালটার স্টাইনমায়ারও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে 'বিপর্যয়কর ভুল' এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি বলে সমালোচনা করেছেন।
মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাব ও মধ্যবর্তী নির্বাচন
আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচন মার্কিন গণতন্ত্রের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা ট্রাম্প তথা রিপাবলিকান রেজিমের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নজিরবিহীন ধস নেমেছে। গত ৩০ মার্চের একটি জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর আস্থা রাখছেন, যা এক সপ্তাহ আগে ৪০ শতাংশ ছিল।
যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব সাধারণ আমেরিকানদের পকেটে পড়ছে, যেখানে তেল, গ্যাস, সার, বিমান ভাড়া এবং বন্ধকী ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম ৩.৯৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত এক মাসের তুলনায় ১ ডলারের বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামও আকাশচুম্বী হয়েছে, মার্কিন অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের স্থায়িত্ব ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার সাথে সাথে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়বে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার টিকে থাকাকে কঠিন করে তুলবে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, রিপাবলিকানরা নির্বাচনে হেরে গেলে ট্রাম্পকে অভিশংসিত করা হতে পারে, যা আগের মেয়াদেও ঘটেছিল।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, এবং বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনায় ট্রাম্পের নিজের রেজিম রক্ষা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। প্রশ্ন হলো, ইরানে রেজিম চেঞ্জ ঘটলেও ট্রাম্পের নিজের ঘরে রেজিম রক্ষা কি সম্ভব হবে?



