হরমুজ প্রণালি: যুদ্ধের নতুন মোড়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজার
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল জির সৈকতে দাঁড়ালে দিগন্তজুড়ে চোখে পড়ে তেলের ট্যাংকার, কন্টেইনারবাহী জাহাজ ও পণ্যবাহী কার্গোর দীর্ঘ সারি। এক মাসেরও বেশি সময় আগে ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখ হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়ে আছে এই বিশাল নৌবহর। সৈকতের ডান দিকে মাত্র ৪০ মাইল দূরেই ইরানের উপকূল, কিন্তু সেই নীল জলরাশি এখন জনশূন্য। যুদ্ধের আগে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ চলাচল করলেও এখন হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে। সেগুলোকেও অনেকটা পথ ঘুরে ইরানের জলসীমা দিয়ে যেতে হচ্ছে এবং বিনিময়ে ইরান সরকারকে দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের মাশুল।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের চাবিকাঠি
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পার হতো। এখন এই জলপথের নিয়ন্ত্রণই হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা এখন নির্ভর করছে একটিই প্রশ্নের ওপর, হরমুজ প্রণালি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চাবিকাঠি কি শেষ পর্যন্ত তেহরানের হাতেই থেকে যাবে? মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ভ্যালি নাসর বলেন, "ইরানিদের কাছে হরমুজ প্রণালি এখন তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল প্রতীকী, কিন্তু এই প্রণালিই এখন তাদের টিকে থাকার একমাত্র মাধ্যম ও উপার্জনের উৎস।"
ইরানের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা
ইরান সরকার ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। দেশটির সংসদীয় কমিশন নতুন আইন পাস করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজকে মাশুল বা টোল দিতে হবে। একই সঙ্গে ‘অবন্ধুসুলভ’ দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এর মাধ্যমে তেহরান মূলত ইউরোপ ও জাপানকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাধ্য করতে চায় এবং পারস্য উপসাগর থেকে চিরতরে মার্কিন নৌবাহিনীকে বিতাড়িত করার স্বপ্ন দেখছে।
ইরানি কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালিকে মিশরের সুয়েজ খালের সঙ্গে তুলনা করে বিলিয়ন ডলার আয়ের স্বপ্ন দেখলেও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ জেমস ডি ফ্রাই বলছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, "সুয়েজ খাল কৃত্রিমভাবে তৈরি হলেও হরমুজ একটি প্রাকৃতিক জলপথ। এর এক তীরে ইরান থাকলেও অন্য তীরে ওমানের অবস্থান। ফলে ওমানের জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করার কোনও আইনি অধিকার ইরানের নেই।"
মার্কিন হুমকি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংকট নিরসনে বারবার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। বুধবারের ভাষণে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল আমদানি করে না; তাই ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর উচিত নিজেদের প্রয়োজনে এই পথ মুক্ত করা। তবে এর কয়েক ঘণ্টা আগেই নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ তিনি হুমকি দেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ইরানকে ধ্বংস করা হবে। এই উদ্দেশ্যে তিনি হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও মেরিন সদস্যকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছেন।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো হাসান আলহাসান সতর্ক করে বলেন, "ইরানের নিয়ন্ত্রণে এই প্রণালি রেখে যুদ্ধ শেষ হলে তা হবে আমেরিকার মিত্রদের জন্য এক ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়। ইরান তখন যাকে ইচ্ছা নিষেধাজ্ঞা দেবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে রাখবে।"
ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে বিকল্প পথ
ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে সৌদি আরব ইতোমধ্যে ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে লোহিত সাগরে তেল পাঠানো শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের তেল ফুজাইরাহ বন্দরের মাধ্যমে সরবরাহ করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কায় আমিরাতের গ্রামগুলোতে এখন শাসক ও সেনাবাহিনীর সমর্থনে নতুন নতুন পোস্টার দেখা যাচ্ছে।
ইউরোপীয় ও এশীয় দেশগুলো এখনও এই পথ সচল করতে কোনও সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখায়নি। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ অবাস্তব এবং একমাত্র ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব। এমনকি ইরানের মিত্র দেশ রাশিয়াও বলেছে, এই প্রণালি নিয়ে যেকোনও সিদ্ধান্ত উপসাগরীয় সব দেশের সম্মতির ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
জিম্মি করার পরিণতি
বোরস অ্যান্ড বাজার থিঙ্ক ট্যাঙ্কের গবেষণা পরিচালক মেহরান হাগিরিয়ান বলেন, "হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করা হবে জলদস্যুতার শামিল, যা ইরানকে বিশ্বজুড়ে পুরোপুরি একঘরে করে ফেলবে।"
অন্যদিকে লণ্ডন সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেসন চুয়াহ এক জটিল সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, "ইরান সরকারকে মাশুল দিলে জাহাজ মালিকরা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়বেন। আর না দিলে জাহাজ ধ্বংসের ঝুঁকিতে থাকবেন। তার মতে, ইরান যা চাইছে তা কেবল যাতায়াত মাশুল নয়, বরং এটি একটি আনুগত্যের পরীক্ষা; যা কোনও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।"



