ট্রাম্পের ইরান তেল দখল ও খারগ দ্বীপ দখলের হুমকি, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বড় ধরনের হুমকি দিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল দখল করতে পারে এবং তেহরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ কবজায় নিতে পারে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
তেল দখলের পছন্দ ও ভেনেজুয়েলা তুলনা
ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেন, "আপনার কাছে সত্যি বলতে কী, আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো ইরানের তেল দখল করা।" তিনি এই সামরিক পদক্ষেপকে এই বছরের শুরুর দিকে ভেনেজুয়েলায় চালানো অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে ওয়াশিংটন দেশটির তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। মার্কিন নেতার এই বক্তব্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এসেছে।
খারগ দ্বীপ দখলের সম্ভাবনা ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, তেল দখলের অর্থ হতে পারে খারগ দ্বীপ দখল করা। তিনি বলেন, "হয়তো আমরা খারগ দ্বীপ নেব, আবার হয়তো নেব না। আমাদের হাতে অনেক বিকল্প আছে।" তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ইরানের রপ্তানি কেন্দ্রে যেকোনো স্থল অভিযান মার্কিন সেনাদের চরম বিপদে ফেলতে পারে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করবে। খারগ দ্বীপটি ইরানের উপকূল থেকে ১৬ মাইল দূরে অবস্থিত এবং ইরানের তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়।
এটি দখল করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত করার ক্ষমতা পাবে, যা তেহরানের অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ তৈরি করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, তেহরান নৌ-চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে মাইন বিছানোর পথ বেছে নিতে পারে, যা অঞ্চলের নৌ-পথকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে।
পেন্টাগনের স্থল হামলা প্রস্তুতি ও সৈন্য মোতায়েন
ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, পেন্টাগন ইরানে প্রায় ১০ হাজার সৈন্য পাঠিয়ে কয়েক সপ্তাহের সম্ভাব্য স্থল হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত সপ্তাহে ২ হাজার ২০০ মেরিনসহ প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মী সেখানে পৌঁছেছে এবং আরও ২ হাজার ২০০ মেরিন ও ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার সদস্য বর্তমানে পথে রয়েছে। এই সৈন্য মোতায়েন যুদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সময়সীমা ও আলোচনার দাবি
ট্রাম্প তেহরানকে যুদ্ধ শেষ করার শর্তাবলীতে রাজি হওয়ার জন্য ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন; অন্যথায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে মার্কিন হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন যে, পাকিস্তানের দূতদের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে এবং এতে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে অস্বীকার করেন।
ইরানি 'উপহার' ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি
ট্রাম্প আরও বলেন যে, তেহরান ওয়াশিংটনকে ‘উপহার’ হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আরও বেশি পাকিস্তানি পতাকাবাহী তেল ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। তার মতে, এই সংখ্যা ১০ থেকে বেড়ে ২০-এ দাঁড়িয়েছে। তিনি দাবি করেন যে, ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই অনুমতি দিয়েছেন।
এছাড়া ট্রাম্প শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি করে বলেন যে, শুরুর দিকের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৃত্যুর পর তেহরানে নতুন দল কাজ করছে। তিনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্ভবত মৃত বা আহত বলে দাবি করেন, যদিও তেহরান নেতৃত্ব অক্ষুণ্ণ থাকার কথা জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব দেখা দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।



