ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ, অর্থনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক প্রভাব
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ ও বৈশ্বিক প্রভাব

ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ইরান যুদ্ধসহ নীতির প্রতিবাদে অসংখ্য মানুষ ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। ২০২৬ সালের ২৮ মার্চের এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

একটি ব্যতিক্রমী যুদ্ধ: যেখানে কোনো জয় নেই

ইরান যুদ্ধকে একটি ব্যতিক্রমী সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যেখানে কোনো পক্ষেরই প্রকৃত জয় নেই। এই যুদ্ধে প্রতিটি দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রতিটি মানুষের জীবনই বিপন্ন হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুকারী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল দ্রুত বিজয় অর্জনের, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়েছে।

গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কার্টুন এই পরিস্থিতিকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। কার্টুনিস্ট ইলা ব্যারনের আঁকা 'সম্রাটের নতুন পোশাক' শিরোনামের কার্টুনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উলঙ্গ অবস্থায় একটি মিসাইল দিয়ে লজ্জা ঢাকতে দেখা যাচ্ছে, আর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক চাপ

এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সীমাবদ্ধতাগুলোকে উন্মোচিত করেছে। পৃথিবীর সর্বশক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধভান্ডারে থাকা সত্ত্বেও, তারা ইরানের সস্তা ড্রোন মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। টমাহক মিসাইলের মতো উচ্চমূল্যের অস্ত্র নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, যার প্রতিটির দাম ২.৬ থেকে ৩.৬ মিলিয়ন ডলার।

অর্থনৈতিকভাবে মার্কিন জনগণ যুদ্ধের প্রভাব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ায়। নিউইয়র্ক টাইমস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেট্রলের ক্রমবর্ধমান মূল্যের প্রভাব আমেরিকান ভোক্তারা ইতিমধ্যেই অনুভব করছেন। খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মসংস্থান বাজারের মন্থর গতির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব নতুন আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, এমনকি যুদ্ধ আজই শেষ হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে।

ইসরায়েলের কোণঠাসা অবস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এই যুদ্ধে ইসরায়েল সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা হয়েছে। নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ট্রাম্প যুদ্ধে জড়িয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনমত এখন নেতানিয়াহুকে দায়ী করছে। ট্রাম্পের 'মাগা' আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বরাও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জনবলসংকট ও অস্ত্রভান্ডার নিঃশেষ হওয়ার মুখোমুখি। তারা ইরানের সস্তা ড্রোন প্রতিহত করা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিক আশ্রয়শিবিরে দৌড়াচ্ছেন।

বৈশ্বিক প্রভাব: ইউরোপ, চীন ও মধ্যপ্রাচ্য

ইউরোপের দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ। ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। ইউরোপের জনগণও জ্বালানি তেল সংকটে ভুগছেন, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার জ্বালানি বর্জনের প্রেক্ষাপটে।

চীনও এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর তাদের নির্ভরতার কারণে উন্নয়ন থমকে গেছে এবং রপ্তানি বাণিজ্য হুমকির মুখে।

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছিল, কিন্তু এখন মার্কিন ঘাঁটির কারণেই ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ওপর প্রভাব: ভারত ও বাংলাদেশ

ভারতে ইরান যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি অনুভূত হচ্ছে। দেশটির ৮৫ শতাংশ এলপিজি গ্যাস মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে। এমনকি শিঙাড়ার মতো জনপ্রিয় খাবার মেনু থেকে বাদ পড়ছে।

বাংলাদেশে সরকারি ভর্তুকির কারণে চা-শিঙাড়ায় এখনো যুদ্ধের আঁচ লাগেনি। তবে নতুন সরকার জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। বিশ্ববাজারে ডিজেল ও পেট্রলের দাম ১০৮ থেকে ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ায়নি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, সরকার প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে এভাবে ভর্তুকি দিলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের অগণিত শ্রমজীবী মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অনিশ্চিত দিন কাটাচ্ছেন। দেশে তাদের পরিবার ও স্বজনদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। বিশ্লেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

পরিবেশগত প্রভাব ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন

'সংঘাত ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র' এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের পরিবেশগত মাশুল অত্যন্ত ব্যাপক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘাতজনিত দূষণ জনস্বাস্থ্য, বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রভাব ফেলছে। ইরানে পানির উৎসগুলো ইতিমধ্যেই নিঃশেষ হওয়ার পথে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের ছেলে ইউসেফ পেজেশকিয়ানের প্রশ্নগুলো এই যুদ্ধের মর্মান্তিক দিক তুলে ধরে: 'আমরা আর কত দিন লড়ব? চিরকাল? ইসরায়েলের সম্পূর্ণ ধ্বংস বা ইরানের আত্মসমর্পণ পর্যন্ত?'

বার্নার্ড শ'র কথায়, যুদ্ধ শুধু ঠিক করে কে অবশিষ্ট রইল। ইরান যুদ্ধে কোনো প্রকৃত বিজয়ী নেই—শুধু হারানো জীবন ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবিষ্যৎ।