ইরানের পারমাণবিক উপাদান জব্দে ট্রাম্পের স্থল অভিযান পরিকল্পনা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের প্রায় ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করতে স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা গভীরভাবে বিবেচনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে সংঘাত প্রশমনে আঞ্চলিক পর্যায়ে আলোচনা চললেও এমন সামরিক পরিকল্পনা নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
ট্রাম্পের চাপের কৌশল ও আলোচনার সম্ভাবনা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের ইরানকে চাপ দিতে বলেছেন যাতে যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবে তারা এই পারমাণবিক উপাদান হস্তান্তরে রাজি হয়। এমনকি আলোচনায় সমাধান না হলে শক্তি প্রয়োগ করে ইউরেনিয়াম দখলের বিষয়টিও তিনি বিবেচনায় রেখেছেন। ট্রাম্প তার রাজনৈতিক মিত্রদের স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরানকে এই পারমাণবিক উপাদান রাখতে দেওয়া যাবে না। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অগ্রগতি করছে এবং দ্রুত একটি চুক্তি সম্ভব হতে পারে।
বর্তমানে পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্ক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। তবে এখনো ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা হয়নি। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ভিন্ন ভিন্ন কারণ উল্লেখ করলেও একটি বিষয়ে তিনি ধারাবাহিক বক্তব্য দিয়েছেন—ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস বা ইউরেনিয়াম জব্দ করতে তিনি কতদূর যেতে প্রস্তুত, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই।
সামরিক প্রস্তুতি ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে ৩,৫০০-এর বেশি সেনা, যার মধ্যে ২,৫০০ মেরিন, মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। রোববার রাতে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে চলতে হবে, না হলে ‘তাদের আর দেশ থাকবে না’। ইরানের ইউরেনিয়াম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের সেই পারমাণবিক ধুলো দিয়ে দেবে।’
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও বর্তমান অবস্থা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত বছরের জুনে হামলা চালানোর আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম এবং প্রায় ২০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ বিভাজ্য পদার্থ ছিল, যা সহজেই ৯০ শতাংশ অস্ত্রমানের ইউরেনিয়ামে রূপান্তরযোগ্য। তবে মার্কিন হামলার পর এসব উপাদানের বড় অংশ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক উপাদান মূলত ইসফাহান ও নাটাঞ্জের স্থাপনাগুলোতে সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযানের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও জটিলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইউরেনিয়াম জব্দের অভিযান অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা ইরানে প্রবেশ করতে হতে পারে, যা বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ডেকে আনতে পারে। সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ ইরানের পাল্টা হামলা উসকে দিতে পারে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। অভিযানে অংশ নেওয়া সেনাদের প্রথমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মাইন ও ফাঁদ নিষ্ক্রিয় করতে হবে, এরপর বিশেষ দলের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ ও নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ৪০ থেকে ৫০টি বিশেষ সিলিন্ডারে সংরক্ষিত থাকতে পারে। এগুলো নিরাপদে পরিবহনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে এবং পুরো অভিযান সম্পন্ন করতে কয়েকদিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্য
ইরান নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও মতপার্থক্য রয়েছে। জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড তুলনামূলক নরম অবস্থানে আছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে তিনি বলেছেন, মতপার্থক্য থাকলেও গ্যাবার্ড দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত। অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ কিছু শীর্ষ রিপাবলিকান এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে, ইরানের ইউরেনিয়াম জব্দে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে আরও জটিল ও বিস্তৃত করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করারও তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।



