হুথি বিদ্রোহীদের অংশগ্রহণে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন হুমকির সৃষ্টি
চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সরাসরি অংশগ্রহণ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল রপ্তানি এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণকে এক ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত এক মাস ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ব বাণিজ্যে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, হুথিদের আগমনে এখন লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ‘বাব আল-মান্দাব’ প্রণালিও হুমকির মুখে পড়েছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব
দুর্গম নৌপথের কারণে ‘দুঃখের দুয়ার’ নামে পরিচিত মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া এই সরু পথটি দিয়ে বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত তেলের ১২ শতাংশ এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ও কন্টেইনার পরিবাহিত হয়। এই প্রণালিটি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধমনী হিসেবে বিবেচিত হয়, যার মাধ্যমে প্রতিদিন লক্ষাধিক ব্যারেল তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা হয়।
হুথিদের হামলা ও এর প্রভাব
গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে গত অক্টোবর থেকে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি। গত নভেম্বর পর্যন্ত তাদের হামলায় অন্তত ১০০টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে শত শত নৌযান বাধ্য হয়ে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাতায়াত করছে। এই পরিবর্তিত রুটে যাত্রা করতে গিয়ে জাহাজগুলোর সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
হুথিদের হুমকি ও ইরানের অবস্থান
গত সপ্তাহে সিএনএন-কে দেওয়া এক বার্তায় হুথিদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের আন্ডারসেক্রেটারি মোহাম্মদ মনসুর জানিয়েছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া এখন তাদের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প। তিনি উল্লেখ করেন যে, হুথি গোষ্ঠীটি তাদের লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে, ইরান সরকারের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজের একটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী যদি জোরপূর্বক হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের সামনে নতুন নতুন প্রণালিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। ইরান পরিস্থিতি আরও জোরালো করতে পুরোপুরি প্রস্তুত বলেও ওই সূত্রটি দাবি করেছে। এই বক্তব্য আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের উপর প্রভাব
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় সৌদি আরব বর্তমানে তাদের তেল রপ্তানির জন্য বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করছে। কিন্তু লোহিত সাগরে ট্যাংকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সেখানে হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও চরমে পৌঁছানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরণের সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
এই সংকটের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে তেল আমদানিকারক দেশগুলো যারা এই সমুদ্রপথের উপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন জরুরি ভিত্তিতে এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।



