অপারেশন সার্চলাইট: ২৫ মার্চের নারকীয় গণহত্যার গোপন রেকর্ডিং ও ইতিহাসের সাক্ষ্য
অপারেশন সার্চলাইট: ২৫ মার্চের গণহত্যার গোপন রেকর্ডিং

অপারেশন সার্চলাইট: ২৫ মার্চের নারকীয় গণহত্যার গোপন রেকর্ডিং ও ইতিহাসের সাক্ষ্য

একাত্তরের মার্চ মাসে রাজনৈতিক আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানি বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব অত্যন্ত গোপনে চরম সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যার প্রাথমিক রূপরেখা অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের জন্য ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন ব্লিটজ’ নামে একটি আপৎকালীন পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিলেন। তবে তিনি দ্রুত উপলব্ধি করেন যে এই সংকটের সমাধান সীমিত সামরিক শক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। সামরিক জান্তার বলপ্রয়োগের নীতির সঙ্গে একমত হতে না পেরে তিনি পদত্যাগ করেন, এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ‘কঠোর’ লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান।

সামরিক পরিকল্পনার গোপন সূচনা

১৫ মার্চ জেনারেল টিক্কা খান ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজাকে রাজনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেন। ১৬ মার্চ তিনি মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকে ডেকে একটি সামরিক অভিযানের খসড়া প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের ভিত্তিতে ১৭ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মূল কাজ শুরু হয়। পরিকল্পনার কাজ গোপনীয়তার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়: রাও ফরমান আলী রাজনৈতিক মূল্যায়ন লেখেন এবং খাদিম হুসেন রাজা মাঠপর্যায়ের দায়িত্বের খসড়া তৈরি করেন। ১৯ মার্চ এই পরিকল্পনা ঊর্ধ্বতন জেনারেলদের কাছে পেশ করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই সামরিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন। তাৎক্ষণিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৬টি ব্যাটালিয়ন, ৩০ হাজার সদস্যের ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং পুলিশ বাহিনীর সব বাঙালি সদস্য নিরস্ত্র করা, শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম নৌঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পরিকল্পনাটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ড. হোসেনের রেকর্ডিং: ইতিহাসের অমূল্য দলিল

২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকা আণবিক শক্তিকেন্দ্রের পদার্থবিদ ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেনের ঘুম ভেঙে যায় গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে। তিনি ছাদে গিয়ে শহরজুড়ে ভারী গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পান। কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানি সেনারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হামলা চালায় এবং ব্যারাকগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেয়। ড. হোসেনের মাথায় একটি বুদ্ধি খেলে: তিনি বুঝতে পারেন সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো ওয়্যারলেসের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছে। তাঁর কাছে ‘সনি টিআর-১০০০’ মডেলের একটি ট্রানজিস্টর রেডিও ছিল। ফ্রিকোয়েন্সি ঘোরাতেই তিনি বিভিন্ন ইউনিটের কথোপকথন ধরতে পারেন।

তিনি উপলব্ধি করেন যে ইতিহাসের স্বার্থে এই কথোপকথনগুলো রেকর্ড করা দরকার। তিনি একটি কেবলের মাধ্যমে রেডিও সেটটির সঙ্গে তাঁর ‘গ্রুন্ডিগ টিকে-২৪’ স্পুল টেপরেকর্ডারটি যুক্ত করেন। ২৬ মার্চ রাত দেড়টা থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত তিনি অসম্ভব ঝুঁকি নিয়ে কথোপকথনগুলো ধারণ করেন। রেকর্ডিং চলার ফাঁকে তিনি এবং তাঁর পরিবার রুদ্ধশ্বাসে সেই কথোপকথনগুলো শুনছিলেন, যা পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয়তার ভয়াবহ রূপ উন্মোচিত করে।

কথোপকথনে গণহত্যার প্রমাণ

ওয়্যারলেস বার্তা থেকে জানা যায়, অপারেশন সার্চলাইটের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় রচিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ইউনিটটি জগন্নাথ হল, ইকবাল হল এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াকত হল লক্ষ্য করে। কথোপকথনে যখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হতাহতের সংখ্যা জানতে চাওয়া হয়, তখন এক ইউনিট জানায় প্রায় ৩০০ জন হতাহত হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত হতে চাইলে ‘কল সাইন ৮৮’ নির্লিপ্তভাবে নিশ্চিত করে যে ৩০০ জনের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, এটিই সবচেয়ে সহজ উপায়, কারণ এতে কাউকে প্রশ্ন করতে হবে না বা জবাবদিহি করতে হবে না।

নিজেদের বর্বরতা আড়াল করতে ভোরের আলো ফোটার আগেই স্থানীয় লোকজন ব্যবহার করে সব মৃতদেহ এক জায়গায় জড়ো করে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রেপ্তারের জন্যও সুনির্দিষ্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়: কন্ট্রোল রুম নিশ্চিত করে যে তারা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে, তবে তাজউদ্দীন আহমদের মতো নেতারা আগেই অবস্থান পরিবর্তন করেছিলেন। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে তাঁর বাড়িতেই হত্যা করা হয়, এবং ডেইলিপিপল পত্রিকার কার্যালয় ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

সাধারণ মানুষের ওপর নিষ্ঠুরতা

সাধারণ জনগণের মনে ত্রাস সৃষ্টির জন্য নিষ্ঠুর নির্দেশ জারি করা হয়: শহরের কোথাও কালো পতাকা বা বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখা গেলে চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে, এবং ভবনমালিক দায়ী থাকবেন। রাস্তার ব্যারিকেড সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্দেশ ছিল যে কাউকে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে হত্যা করা হবে এবং ব্যারিকেডের আশপাশের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। ভয়ভীতি ছড়ানোর জন্য কিছু মানুষকে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বাকিদের ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আটক বন্দীদের খাবার দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কন্ট্রোল রুম উত্তর দেয় যে কিছুক্ষণ খাবার না দেখলে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং বাঙালিদের অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গেও একই নীতি প্রয়োগ করা হবে।

রেকর্ডিং ছড়িয়ে দেওয়া ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

ড. হোসেন রেকর্ডিং সম্পন্ন করার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য এই তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এপ্রিলের কোনো এক সময়ে রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাতপরিচয় লোক আণবিক শক্তিকেন্দ্রের অফিসকক্ষ তছনছ করে, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে টেপটি অফিসে না থাকায় তিনি রক্ষা পান। এপ্রিলের শেষের দিকে মূল অংশগুলো একটি কম্প্যাক্ট ক্যাসেটে ট্রান্সফার করে একজন বন্ধুর মাধ্যমে ঢাকা টেলিভিশনের জামিল চৌধুরী এবং ন্যাপের মঈদুল হাসানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মে মাসেই ‘আকাশবাণী সংবাদ পরিক্রমা’ এবং ‘সংবাদ বিচিত্রা’ অনুষ্ঠানে এটি সম্প্রচারিত হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই রেকর্ডিং বড় ভূমিকা পালন করে: ২ জুন ১৯৭১ তারিখে লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকায় ব্রিটিশ সাংবাদিক পিটার হ্যাজেলহার্স্ট রেকর্ডিংটির প্রতিলিপি উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানান, পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালাচ্ছে। ড. হোসেন ১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের ওয়্যারলেস বার্তাও রেকর্ড করেছিলেন, যা পরে বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

সামরিক কৌশলগত ব্যর্থতা ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

সামরিক কৌশলের আলোকে অপারেশন সার্চলাইট ছিল রাজনৈতিক সংকটকে সামরিক শক্তি দিয়ে চেপে ধরার এক চরম ব্যর্থ দৃষ্টান্ত। পাকিস্তানি জান্তা ভেবেছিল আকস্মিক আক্রমণ ও শীর্ষ নেতৃত্ব নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করা যাবে, কিন্তু তারা যুদ্ধের প্রকৃত ভরকেন্দ্র—বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—চিনতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় জনগণের মন জয় করার কৌশলের পরিবর্তে তারা নির্বিচার নির্মূলের পথ বেছে নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত জয় কিন্তু চূড়ান্ত পরাজয় হিসেবে প্রমাণিত হয়।

এই টেপের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো এটি কোনো বাঙালি, ভারতীয় বা পশ্চিমা সূত্র থেকে নয়, বরং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিজ মুখের কথোপকথনের মাধ্যমে তাদের অপরাধ প্রামাণিকভাবে তুলে ধরে। এটি প্রমাণ করে যে ২৫ মার্চের অভিযান কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সহিংসতা ছিল না, বরং রাষ্ট্রীয় আদেশে পরিচালিত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ড. হোসেনের এই রেকর্ডিং কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, ন্যায়বিচারের দাবিরও ভিত্তি হয়ে উঠেছে।