চতুর্থ সপ্তাহে ইরান-মার্কিন যুদ্ধ: হরমজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ এখন চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। এই সংঘাতের মধ্যেই পেন্টাগন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে তেহরান যেকোনও ধরনের কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এখন পাল্টা আঘাতের তীব্রতা ক্রমাগত বাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার কৌশল
তাদের মূল কৌশলটি হলো, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক শক্তি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আগেই তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন এক অসহনীয় ক্ষত তৈরি করবে, যা ওয়াশিংটনকে পিছু হটতে বাধ্য করবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় হরমজ প্রণালি দিয়ে। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট হুমকি দিয়েছেন যে, এই সময়ের মধ্যে জলপথটি খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ‘ধূলিসাৎ’ করে দেওয়া হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা ইতিহাসের বৃহত্তম সামরিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে একা লড়ছি। হরমজ প্রণালি আংশিক বন্ধ রাখার উদ্দেশ্য হলো এই আগ্রাসনকে আগ্রাসনকারীদের জন্য চরম ব্যয়বহুল করে তোলা।’
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও ইরানের অনড় অবস্থান
কাতার ও ওমানের কর্মকর্তারা গত সপ্তাহ থেকেই যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তেহরানের অবস্থান সম্পূর্ণ অনড়। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগে হামলা বন্ধ না করলে তারা কোনও আলোচনায় বসবে না। গত বছরের ‘১২ দিনের যুদ্ধ’-এর মতো এবারও তড়িঘড়ি কোনও যুদ্ধবিরতিতে যেতে রাজি নয় ইরান। এবারের আলোচনায় বসার জন্য তারা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে আর হামলা না করার নিশ্চয়তা দাবি করছে।
একজন ইউরোপীয় কূটনীতিকের মতে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব মনে করছে হরমজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন হামলা সহ্য করে টিকে থাকাই তাদের জন্য স্বল্পমেয়াদী জয়। তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ এই শাসনব্যবস্থা টিকে আছে, তারা তেলের দাম বাড়িয়ে বিশ্ববাজারকে জিম্মি করে রাখবে। তাদের ওপর আলোচনার কোনও চাপ তৈরি হয়নি।’
হামলার পরিসংখ্যান ও নেতৃবৃন্দের মৃত্যু
পেন্টাগনের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ইরানে ১৫ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি শীর্ষ সারির অনেক নেতা নিহত হয়েছেন। গত এক সপ্তাহে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি নিহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লারিজানির মতো অভিজ্ঞ ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার পথ জানা নেতার মৃত্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১২০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একটি স্কুলে হামলায় ১৬০ জন শিশু নিহতের ঘটনাও রয়েছে।
নওরোজ বার্তায় হুঁশিয়ারি ও অভ্যন্তরীণ চাপ
শুক্রবার পারস্য নববর্ষ নওরোজ উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় ইরানি নেতারা চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেন, ‘নতুন বছর হবে শত্রুদের ওপর চরম আঘাত হানার বছর। ইরান এই ঝড় কাটিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।’ এদিকে উৎসবের আবহেই তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান। তাদের মধ্যে ১৯ বছর বয়সী জাতীয় কুস্তিগির সালেহ মোহাম্মদীও রয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই বিচার প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি একটি লিখিত বিবৃতি দিলেও যুদ্ধের শুরু থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, তার বাবার মৃত্যুর সময় হওয়া হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন। গবেষকদের মতে, লড়াই চলাকালীন সময়ের চেয়ে লড়াই যখন থামবে, তখন ইরান সরকারের জন্য টিকে থাকা বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে উত্তর দেওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের থাকবে না।
অভ্যন্তরীণ নাজুক পরিস্থিতির সম্ভাবনা
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিজ-এর ফেলো রুয়েল মার্ক গেরেখট মনে করেন, প্রকাশ্যে বীরত্ব দেখালেও ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বেশ নাজুক। কয়েক বছর ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের স্মৃতি এখনও টাটকা। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ইরানে কিছুই আর সচল থাকবে না। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাতে সরকার জনগণের দাবি মেটাতে ব্যর্থ হবে, যা নতুন করে গণবিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।’
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতেও পড়ছে। ইরানের কৌশলগত পদক্ষেপগুলো কীভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তন করবে, তা এখন সবার নজরে।



