মার্কিন তেল অবরোধে বিপর্যস্ত কিউবা, যেকোনো সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ঘোষণা
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর তেল অবরোধের মুখে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের শিকার কিউবা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ওয়াশিংটনের যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত। রোববার (২২ মার্চ) এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে কিউবার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্লোস ফার্নান্দেজ ডি কসিও এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।
জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে সামরিক হামলা ঠেকানোর প্রস্তুতি
ডি কসিও তাঁর সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, কিউবা ঐতিহাসিকভাবেই যেকোনো সামরিক হামলা প্রতিহত করার জন্য পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দ্বীপরাষ্ট্রটি ‘দখল’ করার যে হুমকি দিয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, এমন আক্রমণের সম্ভাবনা কম হলেও কিউবা প্রস্তুতি না নিয়ে বসে থাকার মতো ‘বোকা’ নয়।
তেল অবরোধের প্রভাবে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক সংকট
কিউবার জরাজীর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর মার্কিন অবরোধের প্রভাব মারাত্মকভাবে দেখা দিচ্ছে। গত এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বার এবং মার্চ মাসে তৃতীয়বারের মতো দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে। শনিবারের এই বিপর্যয়ের পর রবিবার সকাল পর্যন্ত হাভানার মাত্র পাঁচটি হাসপাতালসহ প্রায় ৭২ হাজার গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা শহরটির ২০ লাখ জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
কিউবার বিদ্যুৎ বিভাগ ও খনিজ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, কামাগুয়ে প্রদেশের ‘নুয়েভিতাস’ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট আকস্মিকভাবে বিকল হয়ে যাওয়ায় পুরো জাতীয় গ্রিড সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। গত তিন মাস ধরে বিদেশি কোনো উৎস থেকে তেল না পাওয়া এবং অভ্যন্তরীণভাবে চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ জ্বালানি উৎপাদিত হওয়ায় কিউবার অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও কিউবার অটল অবস্থান
গত ১৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন যে কিউবার শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে এবং দেশটি নিয়ন্ত্রণের নেওয়ার ‘সম্মান’ অর্জনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। এর আগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর থেকেই কিউবার ওপর তেল সরবরাহ বন্ধের কঠোর নির্দেশ দেন তিনি।
তবে কিউবার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি কসিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনায় কিউবার রাজনৈতিক কাঠামো, সরকারের গঠন বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কিউবার ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ‘সম্পূর্ণভাবে’ আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।
মার্কিন বাহিনীর অবস্থান ও দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা
এদিকে মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল ফ্রান্সিস ডনোভান মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে জানিয়েছেন যে, তাঁদের সৈন্যরা কিউবা দখলের জন্য কোনো মহড়া বা প্রস্তুতি নিচ্ছে না। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, হাভানায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস রক্ষা, গুয়ান্তানামো বে ঘাঁটির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দ্বীপটি থেকে বড় ধরনের গণ-অভিবাসন ঠেকাতে মার্কিন বাহিনী সদা প্রস্তুত রয়েছে।
অন্যদিকে, দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, কিউবা সরকার তাদের ওপর আরোপিত তেল অবরোধের প্রতিবাদে সম্প্রতি মার্কিন দূতাবাসের জেনারেটরের জন্য ডিজেল আমদানির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। বর্তমান এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কিউবার দৃঢ় অবস্থান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ নীতির প্রভাবে দ্বীপরাষ্ট্রটির জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা মোকাবিলায় কিউবা সরকারের পদক্ষেপগুলো এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।



