মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের প্রেক্ষিতে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘আমি কোনো যুদ্ধবিরতি করতে চাই না। যখন আপনি আক্ষরিক অর্থেই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছেন, তখন আপনি যুদ্ধবিরতি চাইবেন না।’ তাঁর এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা প্রেরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানের অব্যাহত হামলা ও পাল্টা পদক্ষেপ
যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করলেও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অবস্থানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলের বেনগুরিয়েন বিমানবন্দরে জ্বালানি ট্যাংকার ও রিফুয়েলিং উড়োজাহাজে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। মধ্য ইসরায়েলেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
এদিকে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় দ্বিতীয়বারের মতো হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থাকে জানানো হয়েছে। পারস্য উপসাগরে বেসামরিক কার্গো জাহাজ ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার অভিযোগ তুলেছে তেহরান। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের দাবি, এসব হামলায় ১৬টি ব্যক্তিমালিকানাধীন কার্গো জাহাজ ধ্বংস হয়েছে।
ট্রাম্পের মিশ্র বার্তা ও কৌশলগত বিবেচনা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে বারবার মিশ্র বার্তা দিয়ে আসছেন। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালে তিনি দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে ‘সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত’ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। সম্প্রতি ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ইরানের সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের মহান সামরিক চেষ্টা গুটিয়ে নেওয়ার কথা আমরা বিবেচনা করছি।’
তবে এই বিবেচনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে স্থল অভিযানে পারদর্শী আরও তিনটি মার্কিন উভচর জাহাজ ও প্রায় আড়াই হাজার মেরিন সেনা প্রেরণের খবর পাওয়া গেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইরানের খারগ দ্বীপ দখল বা অবরোধের বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় রয়েছে, যার উদ্দেশ্য তেহরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে বাধ্য করা।
রাশিয়ার সমর্থন ও ইরানের অবস্থান
ইরানের নেতাদের নওরোজের শুভেচ্ছা জানিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, একনিষ্ঠ বন্ধু ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে তেহরানের পাশে রয়েছে মস্কো। ক্রেমলিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর সংকটে ফেলেছে এবং একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট তৈরি করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জাপানের কিয়োডো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন, ‘আমরা কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করব না। কারণ, আমরা গত বছরের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি চাই না। যুদ্ধ অবশ্যই সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে বন্ধ হতে হবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বাজার ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল
জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বগতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট শনিবার জানান, ট্রাম্প প্রশাসন সমুদ্রে থাকা ইরানি তেল কেনার ওপর ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। এই ঘোষণার পর ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ পুনরায় ইরানি তেল কেনার পরিকল্পনা করছে। ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, ভারতের তিনটি তেল শোধনাগার ইরানি তেল কিনতে প্রস্তুত এবং সরকারি নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সমুদ্রের বিভিন্ন প্রান্তে জাহাজে প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল মজুদ রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ব্যর্থ হয়ে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তবে এখনো তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা
ইরানে মার্কিন স্থলসেনা প্রেরণের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই তীব্র বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক নেভি সিল কর্মকর্তা ও উইসকনসিন থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি ডেরিক ভ্যান ওরডেন সিএনএনকে বলেন, তিনি প্রশাসনকে বিশেষভাবে ইরানে স্থলসেনা না পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। টেনেসি থেকে নির্বাচিত টিম বারচেটও একই সুরে জানান, ‘আমি মনে করি, আমাদের যত দ্রুত সম্ভব সরে আসার কৌশল খুঁজে বের করা দরকার। আমি কোনোভাবেই সেখানে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েন চাই না।’
এসব ঘটনার মধ্যেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সতর্ক করে দিয়েছেন যে চলতি সপ্তাহে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার তীব্রতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে’। তিনি বলেন, ইসরায়েল রাষ্ট্র ও এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের ওপর থেকে প্রতিটি নিরাপত্তা হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত ইরানি সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।



