ইরান যুদ্ধে ট্র্রাম্পের নাটকীয় ঘোষণা: মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত, পেন্টাগনের প্রস্তুতি অব্যাহত
ইরানের সঙ্গে তিন সপ্তাহ ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাঝপথেই এক নাটকীয় মোড় নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে যখন হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা রণতরী নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই ট্রাম্প আভাস দিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে পারে। তবে এই ঘোষণাকে যুদ্ধ থেকে সরে আসা নাকি সংঘাতের আরও বিস্তার, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট এ খবর জানিয়েছে।
ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যম পোস্টে যুদ্ধ কৌশলের পরিবর্তন
শুক্রবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান, তিনি ইরানে মার্কিন সামরিক তৎপরতা কমিয়ে আনার কথা ভাবছেন। একই সঙ্গে তিনি মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন যাতে তারা এই অঞ্চলের তেল সরবরাহ নিরাপদ করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়। মূলত মিত্রদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু করায় তারা সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নিতে গড়িমসি করছে, যা নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ এখন চরমে পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ও জ্বালানি সংকট
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প বলেন, "হরমুজ প্রণালিতে পাহারা দেওয়া এবং পুলিশিং করার দায়িত্ব সেই সব দেশের হওয়া উচিত যারা এটি ব্যবহার করে, যুক্তরাষ্ট্রের নয়!" তিনি আরও বলেছেন, অন্য দেশগুলো যদি এই উদ্যোগ নেয় তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের দাবি, "এটি তাদের জন্য একটি সহজ সামরিক অপারেশন হবে।"
উল্লেখ্য, গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম ৩৩ শতাংশ বেড়েছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজ দলের অনেক রিপাবলিকান নেতাও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
পেন্টাগনের সামরিক প্রস্তুতি ও হোয়াইট হাউসের বিবৃতি
ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে সরে আসার কথা বললেও পেন্টাগনের প্রস্তুতি ভিন্ন কথা বলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, পেন্টাগন ইতোমধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার মোতায়েনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে।
এরই মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সাড়ে চার হাজার মেরিন ও নৌ সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বহরে রয়েছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং সাঁজোয়া যান। এ ছাড়া সান ডিয়েগো থেকে ১১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটকেও দ্রুত রওনা হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানের উপকূলীয় এলাকাগুলো দখলের নির্দেশ দেন, তবে এই বিশেষায়িত ইউনিটগুলোই সম্মুখ সমরে অংশ নেবে।
প্রেসিডেন্টের মন্তব্যের পর হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, "পেন্টাগনের কাজ হলো কমান্ডার ইন চিফকে সব ধরনের বিকল্পের জন্য প্রস্তুত রাখা। এর মানে এই নয় যে প্রেসিডেন্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। তিনি আপাতত কোথাও স্থল সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন না।"
মিত্রদের ওপর চাপ ও ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য
ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত, প্রতিরক্ষা শিল্প, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীকে ধ্বংস করার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তিনি আরও জানান, ওয়াশিংটন বর্তমানে ইসরায়েল এবং আরব মিত্রদের সুরক্ষায় কাজ করছে যারা ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ন্যাটো বা অন্য মিত্রদের নিয়ে খুব একটা কথা বলেননি। কিন্তু তেলের দাম বাড়তে শুরু করায় তিনি তাদের ওপর চাপ দিতে শুরু করেন। মঙ্গলবার ওভাল অফিসে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমি মনে করি ন্যাটো একটি চরম বোকামি করছে। আমি দীর্ঘকাল ধরে ভাবছি ন্যাটো আদৌ আমাদের পাশে দাঁড়াবে কি না।"
ইউরোপীয় নেতারা জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও এই যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে নারাজ। অনেকেই ইরানের ওপর এই আগাম হামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সপ্তাহজুড়ে ট্রাম্পের সুর আরও কঠোর হয়েছে। শুরুতে তিনি লিখেছিলেন, "আমাদের কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই!" কিন্তু পরে ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ ও ‘ভীতু’ বলে গালি দিতেও ছাড়েননি। শুক্রবার বিকেলের মধ্যে তিনি ঘোষণা দেন যে, তার শুরু করা এই যুদ্ধের দায়ভার খুব শিগগিরই মিত্রদের কাঁধে পড়তে যাচ্ছে।



