মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ৮০ কোটি ডলারের ক্ষতি
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দুই সপ্তাহেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটিগুলোতে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন বা ৮০ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেন্ট্রাল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির একটি নতুন বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর প্রথম সপ্তাহেই ইরান পাল্টাপাল্টি হামলায় এই বড় ধরনের ক্ষতিসাধন হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ
যদিও মার্কিন সম্পদের ওপর ইরানি হামলার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও পরিষ্কার নয়, তবে সামরিক অবকাঠামোর এই ৮০ কোটি ডলারের ক্ষতির হিসাবটি আগের যেকোনও রিপোর্টের চেয়ে অনেক বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তার ব্যয় ততটাই বাড়ছে। সিএসআইএস-এর সিনিয়র উপদেষ্টা মার্ক কানসিয়ান বলেন, অঞ্চলটিতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির খবর অনেক কম প্রচার করা হয়েছে। যদিও দৃশ্যত এটি ব্যাপক বলে মনে হচ্ছে, তবে আরও তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত প্রকৃত পরিমাণ জানা সম্ভব নয়।
ইরান মূলত জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মোতায়েন করা মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জর্ডানের একটি বিমান ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডারে। সিএসআইএস-এর মতে, একটি এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার সিস্টেমের দাম প্রায় ৪৮৫ মিলিয়ন ডলার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও প্রতিহত করতে এই রাডার ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ঘাঁটির ভবন ও অন্যান্য স্থাপনায় আরও ৩১০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
হামলার স্থান ও সহায়তা
বিবিসি ভেরিফাই-এর স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরান অন্তত তিনটি বিমান ঘাঁটিতে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের আলী আল-সালিম, কাতারের আল-উদেইদ এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন নতুন ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে। জানা গেছে, এ ক্ষেত্রে রাশিয়া তেহরানকে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে। ইরানের এই নিখুঁত হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তাদের থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে আনতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির মতে, সামগ্রিক নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ২০০ জনে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনই বেসামরিক নাগরিক। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র সঠিক পথেই আছে। শুক্রবার হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “ইরানে আমরা অত্যন্ত ভালো করছি।”
তবে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি এখন টালমাটাল। হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত স্থল সেনা পাঠাবেন কি না, এমন অনিশ্চয়তা বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। ক্ষয়ক্ষতির এই ৮০ কোটি ডলারের হিসাবটি যুদ্ধের মোট ব্যয়ের তুলনায় সামান্য একটি অংশ মাত্র। সিএসআইএস-এর তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম ১২ দিনেই ১৬.৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। পেন্টাগন এখন যুদ্ধের জন্য আরও ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি তহবিল চেয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার বলেন, এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে। তার ভাষায়, “দুষ্ট লোকদের খতম করতে অর্থের প্রয়োজন হয়।”



