পাকিস্তানের বিমান হামলায় ভাইয়ের কবর খুঁজতে ঈদের দিন কাটালেন আফগান যুবক
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের বাসিন্দা শোহরাব ফাকিরি ঈদুল ফিতরের দিনটি কাটিয়েছেন নিজের ভাইয়ের কবর খুঁজে বেড়িয়ে। চলতি সপ্তাহে কাবুলের একটি হাসপাতালে পাকিস্তানের বিমান হামলায় প্রাণ হারান তার ভাই কায়েস ফাকিরি। এই হামলায় নিহতের সংখ্যা ৪০০-এর বেশি বলে দাবি করেছে তালেবান প্রশাসন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
হামলার পটভূমি ও ভুক্তভোগীদের করুণ কাহিনী
পাকিস্তান দাবি করেছে যে তারা প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সন্ত্রাসী ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। তবে, গত সোমবার রাতে কাবুলের একটি মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রে চালানো এই বিমান হামলা ভয়াবহভাবে ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে মনে হচ্ছে। জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৪৩ জন, কিন্তু তালেবান প্রশাসন মৃতের সংখ্যা ৪০৮ জন এবং আহত ২৬৫ জন বলে জানিয়েছে।
শোহরাব ফাকিরির ভাই কায়েস একজন দর্জি ছিলেন, যার একটি ১০ বছরের ছেলে রয়েছে। শেষ তিন মাস ধরে তিনি ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি ছিলেন, এবং পরিবারের আশা ছিল যে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন। হামলার পর শোহরাব ঘটনাস্থলে ছুটে গেলেও ভাইয়ের কোনো চিহ্ন পাননি। টানা দু’দিন তিনি কাবুলের বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি চালান, কিন্তু সফল হননি।
ঈদের দিন কবরস্থানে মর্মান্তিক অনুসন্ধান
আফগান কর্তৃপক্ষ হামলায় অজ্ঞাত নিহতদের গণকবর দেয়ার পর শোহরাব একটি ভিডিও দেখে ভাই কায়েসকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। ঈদের নামাজ শেষে তিনি কাবুলের প্রান্তে একটি পাহাড়ি কবরস্থানে যান, যেখানে অজ্ঞাতদের দাফন করা হয়েছিল। সেখানে তিনি উল্টে রাখা মাটির সারি এবং পাথরের সারি দেখতে পান, কিন্তু কোনো মরদেহ শনাক্ত করার জন্য নাম লেখা ছিল না।
কবরস্থানে দাঁড়িয়ে শোহরাব ফাকিরি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, আমরা তার কবরের অবস্থান জানি না। ঈদের দিনে একজন মানুষের জন্য তার ভাইয়ের দেহ খুঁজে বেড়ানোই সবচেয়ে দুঃখজনক মুহূর্ত।” ভাইয়ের মৃত্যুর খবর তিনি এখনও মাকে দিতে পারেননি, যা তার বেদনাকে আরও গভীর করেছে।
হামলার সময়ের ভয়াবহতা ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তির সাক্ষ্য
হামলাটি ঘটেছিল যখন রোগীরা তারাবীহ নামাজ শেষ করে ডরমিটরিতে ফিরছিলেন। ২৩ বছর বয়সী ওয়ালি নাজির মোহাম্মদ সৌভাগ্যবশত বেঁচে যান। তিনি বলেন, নামাজের পর ক্লান্ত হয়ে একটি ছোট ভবনের নিজের কক্ষে যান, যেখানে প্রায় ২০ জন রোগী ছিলেন। বিস্ফোরণের শব্দে তার ঘুম ভাঙলে তিনি দেখেন যে ঘরটি এবং তার কিছু সহরোগী আগুনে পুড়ে যাচ্ছেন।
নাজির বলেন, “আমাদের ভবনটি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি, কিন্তু দেয়াল ভেদ করে আসা শার্পনেল আমার শরীরে ঢুকে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পরে আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।” হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি সরকারের কাছে প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানান, এমনকি অস্ত্র দেওয়ার অনুরোধও করেন।
উদ্ধারকারী ও সাহায্য সংস্থার বর্ণনা
আফগানিস্তান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জুমা খান নায়েল জানান, অনেক রোগী তাদের চিকিৎসা শেষ করেছিলেন এবং পরের দিন ছাড়পত্র পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হামলা তার আগেই ঘটে। বোমা হামলায় সৃষ্ট আগুন মাইলের পর মাইল দূর থেকেও দেখা গিয়েছিল, যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। তিনি বলেন, “ওই আগুন ছিল অকল্পনীয়, এবং আটকে পড়া মানুষদের কেউই সাহায্য করতে পারেনি।”
হামলার পরদিন সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছান নায়েল, যেখানে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে হাত, পা, এবং মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পেয়েছিলেন, কিন্তু গোটা একটি দেহ খুঁজে পাননি। গোটা এলাকার বাতাসে পোড়া মাংস ও রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের সদস্য মাইসাম শাফিয়েই বলেন, “আমি পরের দিন যখন সেখানে যাই, তখনও সেখান থেকে ধোঁয়া উঠছিল। একটি বড় ভবনে আঘাত হানা হয়েছিল, এবং এখন সেখানে কিছুই নেই—ছাদ ধসে পড়েছে এবং সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
জাতিসংঘের আফগানিস্তান মিশনের উপপ্রধান জর্জেট গ্যাগননের ধারণা, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, “কয়েক শত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।” তিনি উল্লেখ করেন যে মাদক চিকিৎসা কেন্দ্রটি আফগান ডি ফ্যাক্টো প্রশাসনের পরিচালিত একটি স্থাপনার ভেতরে ছিল, যা ২০১৫ সালের আগে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছিল।
ইসলামাবাদ দাবি করেছে যে তারা একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং পাকিস্তানে হামলা চালানো সন্ত্রাসীদের তালেবান আশ্রয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে। এই ঘটনা আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো তদন্তের দাবি জানাচ্ছে।



