সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে ইরানকে শায়েস্তা করতে চায়
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় ইরান ব্যাপক হামলা শুরু করলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হানে। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বর্ধিত প্রবেশাধিকার ও আকাশসীমা ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দেয়। মার্কিন যুদ্ধ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনালাপে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।
সৌদি আরবের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি
মার্কিন ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রিয়াদ পশ্চিম সৌদি আরবের তায়েফে অবস্থিত কিং ফাহাদ বিমান ঘাঁটি আমেরিকানদের জন্য খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। এই ঘাঁটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইরানি শাহেদ ড্রোন থেকে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির তুলনায় অনেক দূরে অবস্থিত, যা বারবার ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। তায়েফ শহরটি জেদ্দার কাছাকাছি, যা লোহিত সাগরের একটি বন্দর। ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে জেদ্দা একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাবে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়, তবে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীকে রসদ জোগাতে জেদ্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে পূর্ব এশিয়া থেকে হাজার হাজার মার্কিন স্থল সৈন্য এই অঞ্চলের পথে রয়েছে। সৌদি আরবের এই ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ইরান বনাম মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের প্রতি সৌদি রাজতন্ত্র এবং অন্য কিছু উপসাগরীয় রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকেই ফুটিয়ে তোলে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেছেন, রিয়াদের মনোভাব এখন হামলার জন্য ইরানকে শাস্তি দেওয়ার উপায় হিসেবে মার্কিন যুদ্ধকে সমর্থন করার দিকে ঝুঁকেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তিন সপ্তাহ ধরে নিয়মিত ফোনে কথা বলছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতও যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং এই সংঘাত দ্রুত শেষ করার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করছে না।
এই মাসের শুরুর দিকে এক ফোনালাপে আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে বলেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এই যুদ্ধ ৯ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার ইরানে হামলা না করার জন্য ট্রাম্পের কাছে তদবির করেছিল। তাদের দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকলেও, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা চালায়, তখন রাষ্ট্রগুলো জেদ ধরেছিল যেন তাদের ভূমি হামলা চালানোর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা না হয়।
তা সত্ত্বেও, যুদ্ধের সিদ্ধান্তের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোকেই সবচেয়ে ভারী মূল্য দিতে হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাত একাই ৩৩৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১ হাজার ৭৪০টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। কাতার যে কোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে, যদিও তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে এবং ক্রমাগত উত্তেজনা প্রশমনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির নিয়ার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক বার্নার্ড হায়কেল বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, এই যুদ্ধের আগে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত নিরপেক্ষ ছিল। কিন্তু যেহেতু তারা আক্রান্ত হয়েছে, তাই তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে যে পাশের বাড়িতে এই কট্টরপন্থী ইরানি শাসনকে নিয়ে তারা শান্তিতে থাকতে পারবে না, যারা যেকোনো মুহূর্তে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে পুরো অঞ্চলকে জিম্মি করতে পারে।
সৌদি রাজধানী রিয়াদ এবং দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ইরানের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তবে এই সংঘাতকে এই অঞ্চলে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইসরাইলের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন যে, ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালানোর জন্য দায়ী। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
কুয়েত ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ বদর আল-সাইফ বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় যা ঘটেছে তা আমাদের যুদ্ধের এক ভিন্ন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে এটি আমাদের ধৈর্য ও সংযমের পরীক্ষা নিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে আমাদের ইসরাইলের ভূমিকার কথা ভুলে গেলে চলবে না। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই যুদ্ধে টেনে আনতে চায়। আর একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই।
উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর চ্যালেঞ্জ
উপসাগরীয় এবং আরব সাগরীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম জালাল বলেন, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এক কঠিন ভারসাম্যের সম্মুখীন। একদিকে তারা ইরানি হামলার বিরুদ্ধে তাদের 'রেড লাইন' বা সীমারেখা টানার চেষ্টা করছে এবং অন্যদিকে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলোও মোকাবিলা করছে। তিনি বলেন, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ইতিহাসের পাতায় এমনভাবে নাম লেখাতে চায় না যে, তারা তথাকথিত এক মুসলিম প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধে পক্ষ নিয়েছিল।
জালাল আরও বলেন, ইরানের এই হামলাগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন এবং এটি এই অঞ্চলকে এক অজানা পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী-আইআরজিসি এখন সব ধরনের বিধিনিষেধ বা প্রথা ভেঙে ফেলেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোকে এখন তাদের রক্ষণাত্মক কৌশলের মধ্যে থেকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইরান কিছু উপসাগরীয় দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে যে, তারা তাদের ভূখণ্ডকে মার্কিন হামলার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দিচ্ছে। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব কর্মকর্তাদের মতে, ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে ইরানের ওপর সরাসরি আক্রমণাত্মক হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্মিলিতভাবে সাজাতে পারে। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন নিরাপত্তার গ্যারান্টির মান নিয়ে সন্দিহান। ট্রাম্প প্রশাসন জিসিসি দেশগুলোকে স্বাভাবিক মার্কিন অনুমোদন ছাড়াই নিজেদের মধ্যে 'প্যাট্রিয়ট' ইন্টারসেপ্টর স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছে। জালাল বলেন, জিসিসির এখন যা প্রয়োজন তা হলো প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে একটি ব্লক হিসেবে কাজ করা এবং সম্মিলিতভাবে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালিতেও ভূমিকা পালন করতে পারে। কুয়েত ইউনিভার্সিটির আল-সাইফ বলেন, আপনি আক্রমণাত্মক এবং রক্ষণাত্মক কাজের সংজ্ঞা কীভাবে দেবেন? গত চব্বিশ ঘণ্টায় এটাই বিতর্কের বিষয় ছিল। তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানের খেলা খেলতে পারে এবং হরমুজ দিয়ে তাদের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু তা আমাদের বিশ্বদর্শনের অংশ নয়। আমরা নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহকারী এই পানিপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করার অভিযানে ন্যাটো এবং এশীয় মিত্রদের পাশে পাননি ট্রাম্প। তাদের অংশগ্রহণ থাকলে ট্রাম্প বিশ্বকে দেখাতে পারতেন যে এই অঞ্চলের দেশগুলোও তার সঙ্গে আছে, যখন মার্কিন যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারগুলো ইরানের উপকূলে বোমাবর্ষণ করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ এই সপ্তাহে মার্কিন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসকে বলেছেন যে, ইরানের কাছ থেকে সমুদ্রপথটির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিতে আমিরাত মার্কিন অভিযানে যোগ দিতে পারে।
সৌদি বিশ্লেষক আবদুল আজিজ আলঘাশিয়ান বলেন, এরপর হয়তো প্রাণঘাতী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পালা আসতে পারে। তার মতে, এই দৃষ্টান্তটি হরমুজ প্রণালিতেই স্থাপিত হতে পারে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করা হবে ভিমরুলের চাকে ঢিল মারার মতো বিপজ্জনক। ইরানের সামরিক বাহিনী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবি সত্ত্বেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। তারা মোটেও একাকী নয়; গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তারা রাশিয়ার কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে। ইরান চীনের কাছ থেকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আক্রমণাত্মক অস্ত্রও গ্রহণ করেছে।
সাবেক এক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এই সপ্তাহে 'সাউথ পারস'-এ ইসরাইলি হামলার পর উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানের দ্রুত পাল্টা হামলা প্রমাণ করে যে তাদের কমান্ড এবং কন্ট্রোল সিস্টেম এখনো অক্ষত। জালাল বলেন, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো সচেতন যে তাদের সামরিক বাহিনী ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারবে না। তাই প্রতিরোধের নামে কোনো প্রতীকী ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা কেবল আরও বেশি পাল্টা হামলারই পথ তৈরি করবে।
তিনি আরও যোগ করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর পদক্ষেপ এই পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের পক্ষে যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির হায়কেল বলেন, সৌদি আরবের ঘাঁটিগুলোতে মার্কিনদের সহজ প্রবেশাধিকারই হবে মূল চাবিকাঠি। তিনি বলেন, এটা সত্য যে সৌদি আরবের বিমান বাহিনী বা ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা কম, কিন্তু সমীকরণটি তখনই বদলে যাবে যখন মার্কিন বিমান বাহিনী কোনো এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের বদলে দাহরান থেকে উড়তে শুরু করবে। এই উপকূলীয় শহরটি ইরানের উপকূল থেকে মাত্র ১৩০ মাইল দূরে অবস্থিত।



