ইরানের সাশ্রয়ী ক্ষেপণাস্ত্রে মার্কিন ব্যয়বহুল এফ-৩৫ বিমান ক্ষতিগ্রস্ত
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে একটি অভূতপূর্ব সামরিক ঘটনা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। ইরানের মাত্র ৩ হাজার মার্কিন ডলারের একটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০ কোটি ডলারের অত্যাধুনিক স্টিলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫-এ আঘাত হেনেছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ ২০২৬) সংঘটিত এই ঘটনাটি বিশ্বে প্রথমবারের মতো ইরানের সামরিক সক্ষমতার নতুন মাত্রা প্রকাশ করেছে।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও ইরানের পাল্টা আক্রমণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানে আগ্রাসন শুরু হয়। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতা ও সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন। এরপর থেকেই তেহরান কঠোর ভাষায় পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরান ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে ইসরাইলের অনেক শহর, সামরিক ও সরকারি স্থাপনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় অনবরত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতি
ইরানের সঙ্গে লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ডজনখানেক অত্যাধুনিক ড্রোন ও ১৬টি যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। তবে ১৯ মার্চের ঘটনাটি সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে, কারণ এটি মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির অপরাজেয়তার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে যে, বৃহস্পতিবার ইরানে একটি যুদ্ধ অভিযান চলাকালীন স্টিলথ ফাইটারটি জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, 'বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলট স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন। এই ঘটনা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।'
স্টিলথ প্রযুক্তির দুর্বলতা ও ইরানের কৌশল
চীনা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে স্টিলথ জেটগুলোকে ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল/ইনফ্রারেড (ইও/আইআর) সেন্সর সিস্টেমের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব। মার্কিন বিমান বাহিনীর এফ-৩৫এ লাইটনিং-২ ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অস্ত্র কর্মসূচি, কিন্তু এর স্টিলথ ক্ষমতা মূলত রাডার-ভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে পরাস্ত করার জন্য তৈরি।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন যে এফ-৩৫ বিমান রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গকে ছড়িয়ে দিতে এবং শুষে নিতে সক্ষম হলেও এর তাপীয় সংকেত পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। ইরান এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে 'প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সর' ভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা বিমান শনাক্ত করতে রাডারের পরিবর্তে তাপীয় সংকেত ব্যবহার করে।
প্যাসিভ সিস্টেমের বিপদ
প্যাসিভ ইনফ্রারেড সিস্টেমগুলো বিশেষভাবে বিপজ্জনক কারণ এগুলো নিজস্ব কোনো রেডিও সংকেত নির্গত করে না। একটি বিমানের রাডার-ওয়ার্নিং রিসিভার আগত রাডার সংকেত শনাক্ত করতে পারলেও প্যাসিভ ইনফ্রারেড ট্র্যাকার আঘাত হানার মুহূর্ত পর্যন্ত সম্পূর্ণ নীরব থাকে। এই ধরনের ব্যবস্থাগুলো হুমকির ব্যাপারে খুব সামান্য বা কোনো আগাম সতর্কবার্তা দেয় না।
এই পদ্ধতি ইতিমধ্যে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। হুথি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইরত মার্কিন এফ-৩৫ বিমানগুলো ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এড়াতে কৌশলী অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছিল।
মার্কিন বিমানের চলাচল ও ঝুঁকি
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে মার্কিন বিমানগুলো এখন আরও পূর্ব দিকে উড়ছে এবং ইরানের আকাশসীমার গভীরে প্রবেশ করছে। এই অঞ্চলেই ইরানের সড়ক-মোবাইল (সহজে স্থানান্তরযোগ্য) বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ঘনীভূত রয়েছে, যেগুলো খুঁজে বের করা এবং ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন।
সড়ক-মোবাইল ব্যবস্থাগুলোর বিশেষত্ব হলো:
- প্রতিটি অভিযানের পর পুনরায় স্থানান্তর করা যায়
- সাধারণ ভূখণ্ডে লুকিয়ে রাখা সম্ভব
- স্থায়ী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার পরেও যুদ্ধক্ষেত্রে হুমকি হিসেবে টিকে থাকে
যুদ্ধের সামগ্রিক প্রভাব
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত এক ডজনেরও বেশি সামরিক বিমান হারিয়েছে। ২ মার্চ কুয়েতে একটি 'ফ্রেন্ডলি ফায়ার' ঘটনায় তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ভূপাতিত হয়। ১২ মার্চ পশ্চিম ইরাকে একটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার বিধ্বস্ত হয়, যাতে ক্রুসহ ছয়জন নিহত হন।
হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে ইরানের উপকূল বরাবর নন-স্টিলথ এ-১০ গ্রাউন্ড অ্যাটাক জেট এবং এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচি হেলিকপ্টারগুলো চলাচল করছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় আকাশসীমাকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে করছে। তবে ইরানের পূর্বদিকের অভ্যন্তরীণ অংশ সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে।
এই ঘটনা সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে এই প্রশ্ন নিয়ে যে ইরান কীভাবে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার দাবি সত্ত্বেও এমন সফলতা অর্জন করল। ইরানের আইআরজিসি একটি পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তারা মধ্য ইরানের আকাশে একটি মার্কিন বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।



