যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত ফাটল: ইরান সংকটে দুই মিত্রের ভিন্ন পথ
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ফাটল: ইরান সংকটে ভিন্ন পথ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত ফাটল: ইরান সংকটে দুই মিত্রের ভিন্ন লক্ষ্য

যুক্তরাষ্ট্র, একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে, ইরানকে দেখে তাদের বিশ্বব্যাপী দায়িত্ব ও কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জনের চশমা দিয়ে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের দৃষ্টিভঙ্গি একান্তই আঞ্চলিক এবং সরাসরি অস্তিত্ব রক্ষার সংকটকেন্দ্রিক। তিন সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এখন স্পষ্ট হচ্ছে যে, দীর্ঘদিনের এই দুই মিত্রের পথ দুটি ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এই খবর জানিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে হামলা ও পাল্টা আক্রমণ

চলতি সপ্তাহে, ইরানের একটি প্রধান গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের বড় ধরনের হামলার পর, তেহরান পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে এবং তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে দাবি করেছিলেন যে এই হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র 'কিছুই জানত না', কিন্তু পরে অবস্থান বদলে বলেন, তিনি ইসরায়েলকে ওই গ্যাসক্ষেত্রে হামলা না করতে সতর্ক করেছিলেন। এই পরিবর্তন দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতবিরোধের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে অনিবার্য মতপার্থক্য

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মতপার্থক্য অনিবার্য ছিল, কারণ উভয় পক্ষের লক্ষ্য ও সক্ষমতা ভিন্ন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইরান বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনি উল্লেখ করেন, "উভয় পক্ষের লক্ষ্য যেমন আলাদা, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও ভিন্ন।" একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ হলো বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ এবং পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে, চলতি বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায়, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইসরায়েলের আঞ্চলিক কৌশল ও সংকীর্ণ লক্ষ্য

অন্যদিকে, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য অনেক সংকীর্ণ। ইসরায়েলের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে এবং জ্বালানি পরিবহনের জন্য তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়, ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার দায়ভার তাদের ওপর নেই। ইসরায়েলের কাছে ইরান একটি সরাসরি অস্তিত্ব রক্ষার সংকট, সেটি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণেই হোক বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে। কার্নেগি এনডাউমেন্টের সাবেক মার্কিন মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, "আমরা একটি বৈশ্বিক শক্তি এবং তারা একটি আঞ্চলিক শক্তি। তাই তাদের হুমকির মূল্যায়ন আমাদের চেয়ে আলাদা লক্ষ্য তৈরি করে।"

ইসরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও যুদ্ধের প্রস্তুতি

ইসরায়েল এখন যেকোনও মূল্যে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করতে চায়। এমনকি এর ফলে ইরানে বিশৃঙ্খলা বা রাষ্ট্রের পতন ঘটলেও ইসরায়েল তাতে পিছপা হতে রাজি নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকায়, ইসরায়েল অর্থনৈতিক ক্ষতি বা প্রাণহানির ধকল সইতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তারা আমেরিকার সাহায্য নিয়ে চিরশত্রু ইরানকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। কিন্তু ওয়াশিংটন অনেক বেশি সতর্ক, কারণ একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মানে বিশ্বজুড়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দা। ট্রাম্প হয়তো ভেনেজুয়েলার মতো একটি সমাধান চান, যেখানে বর্তমান কাঠামো টিকে থাকবে কিন্তু ওপরের স্তরে এমন লোক থাকবে যাদের যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক চিন্তাভাবনা ও সতর্কতা

সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা ড্যানিয়েল শাপিরো বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবতে হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি এবং নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েন নিয়ে। নেতানিয়াহু বা ইসরায়েলিদের মাথায় এসব চিন্তার স্থান নেই। তাদের লক্ষ্য কেবল শত্রুর বিনাশ।" ইসরায়েল মনে করে তারা যুদ্ধে সফল হচ্ছে, তাই তারা তেলের দাম নিয়ে হোয়াইট হাউসের মতো অতটা সংবেদনশীল নয়। তারা ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে হামলাকে যৌক্তিক মনে করে কারণ এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের প্রধান উৎস। কিন্তু ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল একজন বিশ্ব নেতার মতো, কারণ ইরানের পাল্টা হামলায় সৌদি ও কাতারের গ্যাস উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ট্রাম্পের এই ক্ষোভের প্রভাব ইসরায়েলে পড়বেই, কারণ নেতানিয়াহুকেও আগামী অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে এবং তার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন ও সামরিক সহায়তা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অ্যারন ডেভিড মিলার মনে করেন, "যখন ট্রাম্প বলবেন 'থামো', নেতানিয়াহু অনিচ্ছাসত্ত্বেও তা মেনে নেবেন।" সব মতপার্থক্যের মাঝেও দুই দেশের একটি অভিন্ন দুশ্চিন্তা এখনও কাটেনি, সেটি হলো ইরানের কাছে থাকা ৪৪০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, যা তাত্ত্বিকভাবে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা বানানোর জন্য যথেষ্ট। সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাইকেল মিলস্টাইন বলেন, "এটিই হলো এই যুদ্ধের 'হলি গ্রেইল'। এই ইউরেনিয়াম কীভাবে ধ্বংস বা সুরক্ষিত করা যাবে তা এখনও অস্পষ্ট।"

যুদ্ধের সমাপ্তি ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা

অনেকে মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি আলোচনার মাধ্যমেই এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে। তবে ইসরায়েলের সাবেক ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার চাক ফ্রেইলিখ দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার বিপক্ষে। তিনি বলেন, "যদি সামরিক শক্তি ব্যবহার করতেই হয়, তবে জেতার জন্যই লড়া উচিত। সীমিত উদ্দেশ্যে সীমিত যুদ্ধ সাধারণত সবচেয়ে খারাপ ফলাফল নিয়ে আসে।" এই বিতর্ক ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত ফাটল শীঘ্রই মিটবে না, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করবে।