আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাত: গভীরে আঞ্চলিক আধিপত্য ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে গভীর সংঘাত প্রায় ছয় মাস ধরে চলছে। ইরানের মতো এখনো একে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সংজ্ঞা দেওয়া না হলেও কার্যত যুদ্ধই চলছে প্রতিবেশী এই দুই দেশের মধ্যে। বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় অঞ্চল কাবুলে বড় ধরনের হামলা চালাচ্ছে পাকিস্তান; অন্যদিকে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে হামলা চালাচ্ছে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত ইসলামি আমিরাতের সরকার।
সংঘাতের পটভূমি ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ
সোমবার রাতে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে আক্রমণ ঘটলেও আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে তা আশানুরূপ কভারেজ পায়নি। সম্ভবত ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বড় ধরনের যুদ্ধের কারণে এই সংঘাত তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হচ্ছে। পাকিস্তান অবশ্য বারবার দাবি করছে, তারা মাদকাসক্তদের হাসপাতালে আক্রমণ চালায়নি, বরং এমন এক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে যেখানে ‘ফিদাইন’ বা আত্মঘাতী হামলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
যেকোনো সংঘাতের সময় সত্য ও মিথ্যা চট করে আলাদা করা কঠিন, বিশেষ করে এমন এক যুগে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নকল ভিডিও তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের নকল ভিডিও দেখেই পর্যবেক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব আখ্যান প্রকাশ্যে তুলে ধরছেন। ফলে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের এই যুদ্ধে কে জিতছে, তা দ্রুত বলা মুশকিল, যেমনটা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।
ডুরান্ড লাইন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
দুই পক্ষই সুন্নি মুসলমানের মধ্যে লড়াই করছে, এবং ইতিহাস বলছে যখন বাইরের দেশ এই অঞ্চল আক্রমণ করেছে—যেমন ১৯৭৯ সালে রাশিয়া বা ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র—তখন সীমান্তের দুই পারের পাঠানরা এক হয়ে তাদের বিরোধিতা করেছে। অথচ এখন তারা নিজেদের মধ্যে লড়ছে। সার্বিকভাবে দুই দেশের মধ্যে বিতর্কিত ‘ডুরান্ড লাইন’কে কেন্দ্র করে বিরোধ রয়েছে, যা ১৮৯৩ সাল থেকে বিদ্যমান। কখনো এই বিরোধ বাড়ে, কখনো কমে, কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন নির্দিষ্ট সময়কালেই লড়াই করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান?
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও আঞ্চলিক নীতি
কাবুলে বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক, সামরিক পর্যবেক্ষক ও সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক আফ-পাক সংঘাতের প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া নিয়ন্ত্রণের নীতি। ইরান যুদ্ধের এক দিন আগে এই লড়াই শুরু হয়। আফগানিস্তানের এক সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু সময় ধরে আফগানিস্তানে নতুন করে ঘাঁটি বানাতে চায়, বিশেষ করে বাগরাম বিমান ঘাঁটি ফেরত পেতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
আফগানিস্তান ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের দেশে ভবিষ্যতে আর কখনোই ঘাঁটি গড়তে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র। সন্ত্রাসী সংগঠন আল–কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট (একিউআইএস)ও দাবি করেছে, পাকিস্তান বাগরাম বিমান ঘাঁটি দখল করে যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দিতে চাইছে। আফগানিস্তানের পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে আফগানিস্তানে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
কৌশলগত গভীরতা ও পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি
আফগানিস্তানের তালেবান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, এই হামলাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘটনা নয়। পাকিস্তান আসলে আফগানিস্তানকে তাদের ‘কৌশলগত বলয়ের’ মধ্যে রাখতে চায়, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব ঠেকানো এবং অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা। পাকিস্তানে যখনই টিটিপির হামলা বৃদ্ধি পায়, তখন দেশটির সেনাবাহিনী ও সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয়।
কাবুলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, আফগান সরকার প্রায় ৬ হাজার টিটিপি যোদ্ধাকে আটক করলেও তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব, কারণ তাদের ধর্মীয় আদর্শগত অনুপ্রেরণা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মঈন গুল চামকানির মতে, পাকিস্তান আফগানিস্তানে কোনো শক্তিশালী বা স্বাধীন ব্যবস্থা দেখতে চায় না, এবং তালেবান যদি টিটিপির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামে, তবে তা তাদের নিজস্ব আদর্শের পরিপন্থী হতে পারে।
পাকিস্তানের পাল্টা বক্তব্য ও ভারতের ভূমিকা
পাকিস্তানের তরফে অবশ্য এভাবে দেখা হয় না বলে মনে করছেন সে দেশের নাগরিক সমাজের সদস্যরা। পেশাওয়ারের এক সাংবাদিক ও আইনজীবীর মতে, পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে পাকিস্তানের আক্রমণ করা ছাড়া কোনো রাস্তা খোলা নেই। তিনি দাবি করেন, মাদকাসক্তদের নিরাময় ক্লিনিকে হামলা করা হয়নি, বরং গোপন সেনা ছাউনিতে হামলা চালানো হয়েছে।
ওই সাংবাদিক আরও বলেন, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও আফগান তালেবানের (টিটিএ) মধ্যে একটি গোপন সমঝোতা রয়েছে, যার ভিত্তিতে টিটিপি অতীতের যুদ্ধে আফগান তালেবানকে সমর্থন করেছিল। এর বিনিময়ে বর্তমানে আফগান তালেবান পাকিস্তানের সীমান্ত জেলাগুলোতে ইসলামি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় টিটিপিকে সহায়তা করবে বলেই সমঝোতা হয়েছিল। পাকিস্তানের পর্যবেক্ষকদের তরফে ভারতের হাত থাকার অভিযোগও করা হয়েছে, যদিও ভারত এ ধরনের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও বিশ্বের দৃষ্টি
ইরান যুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের এই ‘যুদ্ধ’ ততটা প্রচার পাচ্ছে না, কিন্তু যদি দু’পক্ষে মৃতের সংখ্যা হিসাব করা হয়, তবে দেখা যাবে গত ছয় মাসে আফ-পাক সীমান্তে বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। আজ না হয় কাল গোটা বিশ্বকেই নজর দিতে হবে ২৬০০ কিলোমিটারের এই সীমান্তে। এই সংঘাত কেবল স্থানীয় বিরোধ নয়, বরং এর গভীরে রয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্য, আদর্শগত লড়াই এবং আন্তর্জাতিক শক্তির অদৃশ্য প্রভাব, যা ভবিষ্যতে আরও জটিল রূপ নিতে পারে।
