ইরান যুদ্ধে কে কী চায়? যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরাইলের ভিন্ন অবস্থান বিশ্লেষণ
ইরান যুদ্ধে কে কী চায়? যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরাইলের অবস্থান

ইরান যুদ্ধে কে কী চায়? যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরাইলের ভিন্ন অবস্থান বিশ্লেষণ

বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের দ্রুত অবসান চাইলেও, বিভিন্ন দেশের অবস্থান ও শর্ত ভিন্ন। এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ইসরাইলের লক্ষ্যগুলো পরস্পরবিরোধী, যা যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি করেছে। প্রতিটি পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত স্বার্থ আলাদা, ফলে শান্তি প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্পষ্ট লক্ষ্য ও অভ্যন্তরীণ চাপ

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের উদ্দেশ্য কিছুটা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। কখনো তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে চান, আবার কখনো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সম্পূর্ণ পতন চাইতে দেখা গেছে। ওমানের মধ্যস্থতায় ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় পরোক্ষ আলোচনা চললেও, ইরান তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়া সমর্থন বন্ধ করতে রাজি হয়নি।

ওয়াশিংটনের আদর্শ পরিস্থিতি হলো ইরানে আয়াতুল্লাহদের শাসনের অবসান ঘটানো, কিন্তু সোমবার পর্যন্ত তার কোনো লক্ষণ নেই। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালি আংশিক রুদ্ধ হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তি ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়াচ্ছে। যদি ইরানের শাসনব্যবস্থা দমে না যায়, তবে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

ইরানের কৌশলগত ধৈর্য ও ভৌগোলিক সুবিধা

ইরান যুদ্ধ দ্রুত থামাতে চায়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সব দাবি মেনে নিয়ে নয়। তাদের কৌশলগত ধৈর্য এবং ভৌগোলিক অবস্থান অনুকূলে রয়েছে। ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টির ক্ষমতা তাদের শক্তি।

আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান চায় যুদ্ধের অবসান নিশ্চিত গ্যারান্টির মাধ্যমে, পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ। তবে তারা জানে যে এসব পাওয়া সম্ভব নয়। ইরানের ইসলামি নেতৃত্ব ও রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর যদি সংঘাতে টিকে থাকে, তবে তারা একে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে।

ইসরাইলের নিরাপত্তা হুমকি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার তাড়া সবচেয়ে কম। তারা ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে চায়। ইসরাইল চায় ইরান বুঝুক যে পুনর্নির্মাণের চড়া মূল্য দিতে হবে, কারণ ইসরাইলি বিমানবাহিনী আবারও হামলা চালাতে সক্ষম।

ইরানের মিসাইল ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার। ইরানের উন্নত মিসাইল ও ড্রোন শিল্প, পাশাপাশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইসরাইলের জন্য উদ্বেগের কারণ।

উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষোভ ও সম্পর্কের অবনতি

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমান ইরানের সাথে মানিয়ে নিতে চাইলেও, এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। তারা ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার শিকার হয়ে ক্ষুব্ধ। সৌদি আরব একদিনে ৬০টিরও বেশি প্রজেক্টাইল ভূপাতিত করেছে বলে জানিয়েছে।

এক উপসাগরীয় কর্মকর্তার মতে, "সীমারেখা অতিক্রম করা হয়েছে। তেহরানের সঙ্গে আমাদের আর কোনো আস্থা নেই এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়।" এই যুদ্ধে সমর্থন না জানালেও তারা প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে, ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি জটিল হয়ে উঠেছে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাপ, ইরানের কৌশলগত স্থিতিশীলতা এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ শান্তি আলোচনাকে কঠিন করে তুলছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষোভ আঞ্চলিক সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা ভবিষ্যতের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।